ওয়েব ডেস্ক; ২৫ নভেম্বর : ভরত মাণ্ডপম কমপ্লেক্স এ বছর পরিণত হয়েছে ভারতের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনীতে, যেখানে এক ছাদের তলায় মিলেছে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, স্টার্টআপ উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক বিশেষত্ব। এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত থিমে আয়োজিত ৪৪-তম ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার (IITF) ২০২৫-এ অংশ নিয়েছেন ৩,৫০০-রও বেশি প্রদর্শক, যাদের প্রত্যেকের মধ্যে নিহিত রয়েছে পরিশ্রম, ঐতিহ্য ও আকাঙ্ক্ষার অভিনব গল্প।

১৪ নভেম্বর ২০২৫-এ উদ্বোধন হওয়া এই চৌদ্দ দিনের অনুষ্ঠান শুধু বাণিজ্যিক সমাবেশ নয়; এটি এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রথম-প্রজন্মের উদ্যোক্তা, গ্রামীণ শিল্পী এবং স্বদেশি ব্র্যান্ডগুলি তাদের পণ্যের চাহিদা যাচাই করে, ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, সহকর্মীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয় এবং সরকারি সহায়তা ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পায়। বহু প্রদর্শকের কাছে, IITF মানে বৃহত্তর জাতীয় বাজারে প্রবেশের প্রথম পদক্ষেপ, যা আত্মবিশ্বাসী, ক্রমবর্ধমান এবং
আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিচ্ছবি।

বিহার: কারিগরি দক্ষতা জাতীয় মঞ্চে

বিহার প্যাভিলিয়নে ৪৫ বছর বয়সী শ্রীধি কুমারী দাঁড়িয়ে আছেন ভাগলপুরি সিল্ক ও জরির কারুকার্যের সারির সামনে, যে দক্ষতা তিনি গত ১২ বছরে অর্জন করেছেন। IITF-এ প্রথম অংশগ্রহণকারী হিসেবে তিনি প্রতিফলিত করছেন নারী-নেতৃত্বাধীন উদ্যোক্তা যাত্রাকে। ভাগলপুরি সিল্ক, যা জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত, প্রদর্শন করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি অনুমোদিত বিক্রেতা,” সতর্কভাবে শাড়িগুলি সাজাতে সাজাতে গর্বের সুরে এটি উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, রাজ্যের নারী উদ্যোক্তা প্রকল্পের মাধ্যমে বিহার সরকার তাকে সহায়তা করেছে। “আমাদের সচিব সব নিয়ম বুঝিয়ে দিয়েছেন,” বলতে গিয়ে তিনি প্রথম-বার অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রশাসনিক সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর কাজে রয়েছে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সমন্বিত দক্ষতা, কারণ তাঁর শিল্পীরা দুই রাজ্য থেকেই আসেন, যা আন্তঃরাজ্য বস্ত্রশিল্পের বিনিময়ের প্রতিফলন।

নালন্দা থেকে দিল্লি: যে তাঁতি বছরে একবার এখানে ফিরেই আসেন

কিছুটা দূরে ৪৯ বছর বয়সী তরুণ পাণ্ডে সামলে নিচ্ছেন নরম বাওনবুটি শাড়ি – সূক্ষ্ম নকশায় বোনা। এটি তাঁর IITF-এ অষ্টম অংশগ্রহণ। নালন্দার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের প্রতিনিধি তিনি, যেখানে গ্রামের পর গ্রাম ধরে এই হস্তশিল্প বহমান। প্রতিটি শাড়ি সম্পূর্ণ করতে লাগে প্রায় সাড়ে তিন দিন, যা সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, IITF-ই তাঁর প্রধান বার্ষিক প্রদর্শনী। আয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি এখানে প্রায় দুই থেকে আড়াই মাসের সমপরিমাণ আয় করি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা অন্য মেলায় যাই না, IITF-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

কৃষক থেকে উদ্যোক্তা: সুযোগের পরিসর বাড়ছে

মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার ৫১ বছর বয়সী প্রহ্লাদ রামরাও বোরগাড ও তাঁর স্ত্রী কাভেরি দর্শকদের স্বাগত জানান সুশৃঙ্খলভাবে প্যাকেট করা জৈব ডাল, হলুদ, আদা, আচার এবং বিভিন্ন মশলার সঙ্গে। আজীবন কৃষিকাজের পর তিনি ২০১২ সালে জৈব চাষ শুরু করেন এবং ২০১৫ সালে স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও MSME দপ্তরের সহায়তায় ‘সূর্য ফার্মার্স’ প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি জানান, “অনলাইনে IITF-এর বিজ্ঞাপন দেখে মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে যাই। তারা পুরো প্রক্রিয়া বুঝিয়ে দিয়েছে।” এটি তাঁর দ্বিতীয় অংশগ্রহণ, আগে ছিলেন আইআইটিএফ ২০২৩-এ, পাশাপাশি, অংশ নিয়েছেন সরস মেলা ২০২৪-এ।

ঐতিহ্যের রক্ষণাবেক্ষণ: লাতুরের ‘গোধারি’ শিল্প

মহারাষ্ট্র প্যাভিলিয়নে রুক্মিণী গণেশপাট সালগে দাঁড়িয়েছেন তাঁর ১৫ বছর বয়সী মেয়ে দীক্ষাকে সঙ্গে নিয়ে। তাঁদের স্টলে সাজানো ঐতিহ্যবাহী গোধারি, যা লাতুর অঞ্চলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরা লালন করে এসেছেন। “এটি আমার প্রথম বছর IITF-এ,” বললেন রুক্মিণী, রঙিন কম্বল ঠিক করতে করতে।

ঝাড়খণ্ড: ৪০০ আদিবাসী নারীর প্রতিনিধিত্বে লাক্ষা চুড়ি

ঝাড়খণ্ড- ২০২৫-এ এরাজ্য প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন চলছে, এ বছর IITF-এর ‘স্টেট ইন ফোকাস’। এখানে ৪৯ বছর বয়সী ঝবর মাল প্রদর্শন করছেন ঐতিহ্যবাহী লাক্ষার চুড়ি, যা বহু আদিবাসী সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার। গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি অংশ নিচ্ছেন এবং জানান, তিনিই IITF-এ একমাত্র ল্আক্ষা চুড়ি বিক্রেতা।

বাণিজ্য মেলা: অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বিশেষ ভূমিকায়

IITF-এর মতো ট্রেড ফেয়ার শুধু সরাসরি বিক্রির সুযোগই সৃষ্টি করে নি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদী ক্রেতা অর্জন, বাজারের আচরণ বোঝা এবং ভবিষ্যৎ অর্ডার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বহু প্রদর্শক বলেন, মেলা-পরবর্তী অর্ডারও প্রায়শই কয়েক মাসের আয়ের সমপরিমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

২০২৫ সালের এই আয়োজন বিকশিত ভারত ২০৪৭–এর বৃহত্তর লক্ষ্যকে প্রতিফলিত করে, যেখানে রয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতি, রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্য সংযোগ, যার মধ্যে রয়েছে চলমান একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) আলোচনা।