দেখো গিন্নিমা, তুলসী গাছটা বোধহয় নতুন বসিয়েছে।জমিদার বাড়ির সামনের ইটের রাস্তার ওপাশে, কালীমন্দিরের তুলসীমঞ্চটার দিকে দাওয়ায় বসে জর্দা পান চিবোনো জমিদার গিন্নি এবং আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করালো হরিশের মা। গিন্নিমার বাড়িতে পানীয় জল আনতে আসার তাড়ার বহরে গাছের দিকে আমার ভ্রুক্ষেপ না থাকলেও হরিশের মায়ের সেদিকে নজর পড়েছে।

লকডাউনে ভিড়ের ঠেলায় ভরদুপুরে জল নেওয়াই শ্রেয়। সকালবেলা তো এখানে পা রাখাই দুষ্কর। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলেও, জলের লম্বা লাইন বিশাল সর্পাকৃতি ধারণ করে। সাতসকালে জল আনতে এলে একেবারে বেলা গড়িয়ে যায়। তাছাড়া, গ্রামের উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক বিভাগে পিয়নের চাকরিটার দরুন সকালে আমার জল নেওয়াটা সম্ভব হয় না। গত দুপুরেই জল আনতে এসে আমাদের গ্রামের এই বন্ধ মন্দিরের তুলসীমঞ্চের মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো-মরা-কঙ্কালসার গাছটা চোখে পড়লেও আজ তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ একটা নতুন হরিৎ পত্রযুক্ত তুলসী গাছ আমাকে একটু অবাকই করলো।

  • সত্যি তো ! গাছটা কালকেও ছিল না।
    মুখে একটা কৌতুহলী রেখা ফুটে উঠল আমার। লকডাউনের জেরে গ্রামের অন্যান্য জায়গার মন্দিরগুলোর মতো আমাদের এই গ্রামের মন্দিরেও পূজার্চনা স্থগিত। পুরোহিত এখন তার দেশের বাড়িতে। মাসকয়েক ব্যবধানে মন্দিরের আনাচে-কানাচে পুঞ্জিভূত ধুলোর রাজ্যে মন্দিরের জৌলুস অবলীলায় ক্ষুন্নিত হয়েছে। যেন একধাপে কয়েক বছর বয়স বৃদ্ধি পেয়েছে মন্দিরটার।

জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুরের ঝা ঝা রোদের দাবদাহে, রাস্তার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত আপনমনে ঘুরে বেড়ানো একটি পাগল ছাড়া গোটা গ্রাম এখন নিস্তব্ধতার কম্বল ঢাকা দিয়েছে। পাগলটার পরনে একটা মেরুন ট্রাউজার এবং ফুলছাপ টি-শার্ট। মাথার চুল ছোট করেকাটা, পেতে আঁচড়ানো। তার পরিপাটি বেশভূষা এবং ময়লাশূন্য শরীর দেখে বেশ অবস্থাপন্ন ঘরের বলেই মনে হয়। বয়স কতই বা হবে আর – ষোল কিংবা সতেরো।

নিজের মনেই সে বারংবার কি যেন বিড়বিড় করে চলেছে আর জমিদার বাড়ির এই কলতলার ধার ঘেঁষে অনেকদূর পর্যন্ত চলে যাওয়া লম্বা হাইড্রেনের কালো জলে অর্ধনিমজ্জিত শরীরে জবুথবু হয়ে থাকা দুটি ডাগর, মিশকালো কুকুরের দিকে ভ্যাংচানোর ভঙ্গিমায় মুখবিকৃত করছে।

হরিশের মায়ের জল নেওয়ার পর আমার পালা। পরপর বেশ অনেকগুলোই বালতি নিয়ে এসেছে সে। একেই আজ আমার অন্যান্য দিনের তুলনায় ঈষৎ দেরি হয়ে গেছে। তার ওপর আবার হরিশের মায়ের বড় বড় বালতির সম্ভার দেখে এটা আন্দাজ করা খুব একটা দুঃসাধ্য হলো না, যে আরও প্রায় মিনিট কুড়ি অপেক্ষমান থাকতে হবে আমাকে।

আচমকা পাগলটা মন্দিরের পেছনের পাঁচিল ঘেরা মানুষের অব্যবহার্য, আবর্জনাময় একটা ভ্যাট থেকে একটা দুধের খালি প্যাকেট কুড়িয়ে নিয়ে সটান পানীয় জলের কলের সামনে এসে হরিশের মায়ের বসানো বালতিটাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দুধের প্যাকেটটায় জল ভরল।

  • এই যা। দূর হ এখান থেকে। পাগল কোথাকার!
    রাগে অগ্নিশর্মা হরিশের মাকে কোনরকম পরোয়া না করেই পাগলটা প্যাকেট থেকে খানিকটা জল খেয়ে বাকি জলটা মন্দিরের তুলসী গাছের গোড়ায় ঢালল। তারপর একছুটে দাওয়ায় জমিদার গিন্নির পাশে এসে বসল।

আবর্জনার ভ্যাটটা থেকে মাঝেমধ্যে একটা বমনোদ্রেককারী উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগছে। পেটের ভিতর থেকে অন্নপ্রাশনের ভাত যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসার জোগাড় সেই গন্ধে। গিন্নিমা এতক্ষণ সমস্তটা লক্ষ্য করছিলেন। এবার তিনি মুখ খুললেন, – কাল মেন্টাল কেয়ারিং হোস্টেল থেকে কয়েক মাসের ছুটি নিয়ে এখানে এসেই ও মরা তুলসী গাছটা তুলে নতুন গাছ বসিয়েছে। তুমি কি যেন বলছিলে হরিশের মা? পাগল ? হ্যাঁ আমার ছেলে পাগল বলেই এতদিনের শুকনো তুলসী গাছটা ওর চোখে পড়েছে। সত্যিই ওর চিন্তাভাবনা সাধারণ মানুষের থেকে অনেক আলাদা।

হৃদয়ের গহীন অন্তরাল ফুঁড়ে নির্গত আবেগের দরিয়ায় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো চোখের কোন দুটো।আমার দৃষ্টি তখন নির্বাক হরিশের মায়ের দিকে। জলের কলটার ঠিক পাশেই স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঠিক গতকালের মরা তুলসী গাছের মতো।