ওয়েব ডেস্ক; ২০ ফেব্রুয়ারি : নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এ বিশ্বের প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রের নেতা ও নীতি-নির্ধারকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় মিলিত হয়েছেন। ১৬ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে মূল লক্ষ্য হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে রূপ দেওয়া, যার কেন্দ্রে থাকবে মানবতা।

১৯ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এআই কেবল ডেটা বা অ্যালগরিদম চালিত কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নয়, বরং এটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা, নীতি ও মর্যাদারই প্রতিফলন। তিনি এই মানব-কেন্দ্রিক ভাবনাকে এম.এন.এ.ভি (M.A.N.A.V.) শব্দটির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। এটি এমন এক পথনির্দেশিকা, যেখানে প্রযুক্তি এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকবে। এই পাঁচটি স্তম্ভ হলো : নৈতিক ব্যবস্থা, দায়বদ্ধ শাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সহজলভ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই এবং বৈধ ব্যবস্থা।

এম.এ.এন.ভি দর্শনের প্রথম স্তম্ভ অনুযায়ী এআই ব্যবস্থার ভিত্তি হতে হবে নৈতিকতা। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান যে, স্বচ্ছতা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ এই প্রযুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে ইতিমধ্যে ডিজিটাল ও এআই শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা শুরু থেকেই তথ্যের বিশ্লেষণ এবং নৈতিক প্রয়োগ সম্পর্কে শিখতে পারছে।

এই সম্মেলনে ভারত এক অনন্য নজির গড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ২,৫০,৯৪৬টি শপথ জমা পড়েছে, যা একটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। এর মাধ্যমে এআই-এর নৈতিক ব্যবহার একটি জাতীয় প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ দায়বদ্ধ শাসন নিশ্চিত করতে ১০,৩০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয়ে ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’ অনুমোদিত হয়েছে। এই মিশনের লক্ষ্য কেবল উদ্ভাবন বা পরিকাঠামো তৈরি নয়, শুরু থেকেই এআই-এর ওপর সঠিক নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিশ্চিত করা।

সার্বভৌমত্ব এবং অন্তর্ভুক্তি
তৃতীয় স্তম্ভ হল, জাতীয় সার্বভৌমত্ব। প্রধানমন্ত্রী জানান যে, প্রযুক্তির বিশ্বে সার্বভৌমত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ডেটা, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোও এর অন্তর্ভুক্ত। ভারত সেমিকন্ডাক্টর মিশন এবং নিজস্ব এআই মডেল তৈরির মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে।

চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে সহজলভ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক
এআই-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারতের লক্ষ্য হল, এই প্রযুক্তি গুটিকতক মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া। ‘মেঘরাজ জিআই ক্লাউড’ এবং ‘ইন্ডিয়াএআই কমপিউট পোর্টাল’-এর মাধ্যমে স্টার্টআপ ও গবেষকরা সহজেই জিপিইউ বা টিপিইউ-র মতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।

পঞ্চম স্তম্ভ হল, বৈধতা ও নিরাপত্তা। ডিপফেক যখন সামাজিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করছে, তখন এআই ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আইনি বৈধতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ‘তথ্যপ্রযুক্তি সংশোধনী নিয়ম ২০২৬’ অনুযায়ী এই ধরনের কৃত্রিম আধেয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ইন্ডিয়াএআই মিশনের অধীনে পক্ষপাতহীন ব্যবস্থা ও গোপনীয়তা রক্ষার মতো বিষয়গুলিতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই
এম.এন.এ.ভি দর্শন বিশ্বের কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক নতুন দিশা উন্মোচন করেছে, যা শুধুমাত্র প্রযুক্তির নয়, মানবতার জয়-ও নিশ্চিত করবে।