ওয়েব ডেস্ক; ২৩ জানুয়ারি : কেন্দ্রীয় সরকারের নমামি গঙ্গে কর্মসূচি–র আওতায় ব্যারাকপুরের ICAR–সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICAR–CIFRI) পরিচালিত এক দশকব্যাপী বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, গঙ্গা নদী এখনও মাছের বৈচিত্র্য রক্ষা বজায় রেখেছে। তবে, একই সঙ্গে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বহু প্রজাতির মাছ বর্তমানে অসুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের সংরক্ষণের জন্য ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত এই বিস্তৃত গবেষণায় গঙ্গা অববাহিকা জুড়ে মোট ২৩০ প্রজাতির মাছ নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২১-টি দেশীয় (নেটিভ) এবং নয়টি বিদেশি (এক্সোটিক) প্রজাতির, যা এই নদী ব্যবস্থার পরিবেশগত গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গবেষণায় আরও জানা গেছে, নথিভুক্ত প্রজাতির প্রায় ১০ শতাংশ IUCN–এর রেড লিস্টে বিপন্ন শ্রেণিভুক্ত, যা ক্রমবর্ধমান সংরক্ষণ–সংক্রান্ত উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গার অ-লবণাক্ত জলের অংশে সাইপ্রিনিডি (Cyprinidae) সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের গোষ্ঠী। এই শ্রেণীর মাছে অন্তর্ভুক্ত ভারতীয় প্রধান কার্প ও মিনো প্রজাতিগুলি অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদের মেরুদণ্ড হিসাবে কাজ করে এবং নদী–নির্ভর অসংখ্য মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।
কয়েক দশকের অবক্ষয়ের পর পুনরুদ্ধার
দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের এই ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক নথি গঙ্গার পরিবেশগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে।
১৮২২ সালে পরিচালিত প্রথম বৃহৎ সমীক্ষায় ২৭১ প্রজাতির মাছ নথিভুক্ত হয়েছিল, যা এক অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের পরিচায়ক। তবে, দ্রুত শিল্পায়ন, অপরিশোধিত নিকাশী জল নিঃসরণ, আবাসস্থল ধ্বংস, জলমানের অবনতি এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে, ধীরে ধীরে এই বৈচিত্র্য হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭৪ সালে মাছের প্রজাতি সংখ্যা নেমে আসে ২০৭–এ এবং ১৯৯১ সালে তা আরও কমে হয় ১৭২।
পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটজনক হয়ে ওঠে ১৯৯৮ সালে, যখন মাছের বৈচিত্র্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে মাত্র ১১০ প্রজাতিতে পৌঁছায়।
এই প্রেক্ষাপটে, সাম্প্রতিক গবেষণায় নথিভুক্ত ২৩০ প্রজাতির মাছের উপস্থিতি গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এই উন্নতির পেছনে নদী পুনরুজ্জীবনমূলক ধারাবাহিক উদ্যোগ, উন্নত মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং নমামি গঙ্গে–সহ বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
মাছের বৈচিত্র্যে শীর্ষে উত্তর প্রদেশ
এই মূল্যায়নে গঙ্গা অববাহিকার ৩৩-টি উপনদী এবং ছয়টি প্লাবনভূমির জলাভূমি অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাছের বৈচিত্র্যের দিক থেকে উত্তর প্রদেশ সর্বাধিক সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে উঠে এসেছে, যেখানে বিজনৌর এলাকায় ১০৯ প্রজাতি এবং নরোরা এলাকায় ৯৩ প্রজাতির মাছ নথিভুক্ত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে ৮৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। বহরমপুর, ফ্রেজারগঞ্জ, বলাগড় ও ত্রিবেণী–সহ অন্যান্য এলাকায় মাঝারি মাত্রার মাছের পুনরুদ্ধার লক্ষ্য করা গেছে। তবে ডায়মন্ড হারবার ও গদখালি–র মতো নিম্ন মোহনা অঞ্চলে এখনও তুলনামূলক কম মাছের বৈচিত্র্য নথিভুক্ত হয়েছে।
র্যাঞ্চিং বা নদীতে মাছের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজনন ও জলমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
মাছ নিয়ে চর্চা করছেন যে বিজ্ঞানীরা, তাঁরা জানিয়েছেন, মাছের সংখ্যা পুনরুদ্ধারে স্টক এনহ্যান্সমেন্ট ও রিভার র্যাঞ্চিং কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ICAR–CIFRI মোট ১৬৭-টি র্যাঞ্চিং বা মাছের প্রজনন সংক্রান্ত বিজ্ঞানভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করেছে, যার মাধ্যমে ২.০৩ কোটিরও বেশি মাছ—যার মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল–সহ ভারতীয় প্রধান কার্প এবং মহা শোল—নদীতে ছাড়া হয়েছে। এর ফলে, প্রয়াগরাজে ভারতীয় প্রধান কার্পের আগমন ১৯৫৯ সালের তুলনায় ২৪.৭ শতাংশ এবং বারাণসীতে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জলমানের উন্নতিও পুনরুদ্ধারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে গঙ্গার জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ১৯৮০–র দশকের তুলনায় বেশি এবং ক্ষতিকর ধাতু ও কীটনাশকের উপস্থিতি অনুমোদিত সীমার অনেক নীচে রয়েছে।
ICAR–CIFRI–এর অধিকর্তা ড. বসন্ত কুমার দাস বলেছেন,“এই পুনরুদ্ধার বিভিন্ন পুনরুজ্জীবনমূলক উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাবের প্রতিফলন, যার মধ্যে নমামি গঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই গবেষণার ফলাফল গঙ্গা অববাহিকায় নীতিনির্ধারণ, সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং সুস্থায়ী মৎস্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তির হদিস দেয়।”
