ওয়েব ডেস্ক; ৬ অক্টোবর: ডলফিন তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং সৌন্দর্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ভারতে এই সুন্দর প্রাণীর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনই আছে পরিবেশগত গুরুত্ব। এরা পরিচিত তাদের সক্ষমতা এবং মজার চরিত্রের জন্য। এর জন্য বন্যপ্রাণ প্রেমীদের কাছে এর আকর্ষণ অত্যন্ত বেশি।
ভারতে উপকূল অঞ্চলে এবং মিষ্টি জলে বিভিন্ন ধরনের ডলফিনের বাস। এদের মধ্যে প্রধান দুটি শ্রেণী হ’ল – ইন্দো প্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন এবং গ্যাঞ্জেটিক রিভার ডলফিন। নিজ নিজ অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই ডলফিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। গ্যাঞ্জেটিক রিভার ডলফিনের গায়ের রং গোলাপী এবং মিষ্টি জলে মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে এদের। এগুলি মূলত পাওয়া যায় গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের শাখা নদীগুলিতে।
তবে, ডলফিন সংরক্ষণে অনেক সমস্যা আছে, যেমন – বাসস্থানের বিচ্ছিন্নতা, জল দূষণ, মৎস্যজীবী এবং অন্যান্য মানুষের উপদ্রব, বাঁধ, জলাধার এবং জলবায়ু পরিবর্তন। ভারতে ডলফিন সংরক্ষণের প্রধান সমস্যা এদের বাসস্থানের অবনমন। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং ক্ষণস্থায়ী কৃষি কাজের ফলে হচ্ছে জলদূষণ, বাসস্থানের ধ্বংস-সাধন, নদী এবং জলাশয়ে জলের সরবরাহও কমছে। এই পরিবর্তনের ফলে ডলফিনের বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষি অবশেষ, শিল্প বর্জ্য এবং গৃহস্থালী বর্জ্যের ফলে যে দূষণ ঘটছে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ডলফিনের। জল দূষণের পাশাপাশি, খাদ্যাভাব ঘটছে এবং তাদের খাদ্যের মধ্যে টকসিনের মাত্রা বেশি হওয়ায় সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে ডলফিনের।
মাছ ধরার কারণেও পরোক্ষভাবে ক্ষতি হচ্ছে ডলফিনের। এমনকি, সমুদ্রে শিল্প বা শিল্পায়নের ফলেও ক্ষতি হচ্ছে। অনেক সময়েই মাছ ধরার জালে আটকে গিয়ে আহত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। নদীতে বাঁধ বা জলাধার নির্মাণের ফলে জলের স্বাভাবিক স্রোত্ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ডলফিনের সংখ্যা কমছে। এই ধরনের ঘটনার ফলে ডলফিনের জিনগত বৈচিত্র্য কমছে। নিজ গোষ্ঠীর মধ্যেই প্রজনন হওয়ায় বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলস্তর বৃদ্ধির মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরোক্ষভাবে পড়ছে ডলফিনের উপর। বিভিন্ন জলে বিশেষ ধরনের মাছের উপস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে এবং তাদের বাসস্থানেরও ক্ষতি হচ্ছে।
এই গুরুত্ব বিবেচনা করে পরিবেশের উন্নতির জন্য এবং মানুষের কল্যাণে ভারত সামুদ্রিক এবং নদীর ডলফিনের সংরক্ষণে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০২০-তে ভারত সরকার ডলফিন প্রকল্পের সূচনা করে। এর লক্ষ্য মিষ্টি জলের এবং সামুদ্রিক ডলফিনের সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জলকে ডলফিনের বসবাসযোগ্য করে তোলা, ডলফিন গণনা এবং চোরা শিকার প্রতিরোধ। এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয়েছে মৎস্যজীবী এবং নদী ও সাগর-নির্ভর জনগোষ্ঠীগুলিকে। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেরও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ডলফিন সংরক্ষণের লক্ষ্যে যে কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে, তাতে নদী ও সাগরের দূষণ হ্রাসেও সহায়তা হবে।
এছাড়াও, গ্যাঞ্জেটিক রিভার ডলফিনকে ভারতের জাতীয় জলজ প্রাণীর আখ্যা দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক। কেন্দ্রের ‘ডেভেলপমেন্ট অফ ওয়াইল্ডলাইফ হ্যাবিট্যাটস্’ কর্মসূচিতে রাজ্যগুলিকে আর্থিক সহায়তা দিতে ২২টি বিলুপ্তপ্রায় শ্রেণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ডলফিনকে। গঙ্গায় ডলফিনের বসবাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলিকে সংরক্ষিত এলাকার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যেমন – বিহারের বিক্রমশিলা ডলফিন স্যাংচুয়ারি। একটি সার্বিক কর্মপরিকল্পনা (২০২২ – ২০৪৭) তৈরি করা হয়েছে, যাতে নদীর ডলফিন এবং তাদের বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এতে বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ও মন্ত্রকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
সেজন্য ভারতের ডলফিনের সংরক্ষণ একটি বহুমুখী উদ্যোগ। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, এনজিও, স্থানীয় মানুষ এবং জনগণের সমন্বিত প্রয়াস। বসবাসযোগ্য স্থানের অবনতি, দূষণ, মৎস্য শিকারের ফলে সৃষ্ট সমস্যা, শব্দ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করতে পারলেই একমাত্র সামুদ্রিক ডলফিন এবং সামুদ্রিক পরিবেশ দীর্ঘ মেয়াদে রক্ষা করতে পারবে ভারত। ভারতীয় জলাশয়ে এই সুন্দর প্রাণীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রয়াস। “ডলফিন সংরক্ষণে তরঙ্গ”!
সূত্র: পি আই বি
