ওয়েব ডেস্ক; কলকাতা , ১৮ ফেব্রুয়ারী : স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে ধর্মীয় বক্তৃতা প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বকে মুগ্ধ করে ১৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ফিরে আসেন – এ বিষয়টি আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু সেই বিশেষ দিনে অর্থাৎ ১৮৯৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি সম্পর্কে খুব বেশি বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) থেকে জাহাজে করে বজবজে এসে পৌঁছান স্বামী বিবেকানন্দ। জাহাজে ভ্রমণকালীন শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকরা তাকে নিয়মিত জলের পরিবর্তে নারকেলের জল পান করার পরামর্শ দেন। সেই কারণে জাহাজে প্রচুর পরিমাণে নারকেল বোঝাই করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, স্বামীজি ঐ নারকেলগুলি সহযাত্রী ও বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। এছাড়াও, জাহাজে ভ্রমণকালে বিভিন্ন সময়ে তিনি বক্তৃতা প্রদান করেন, যা সহযাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়।
কলকাতায় দারভাঙ্গা মহারাজের সভাপতিত্বে স্বামী বিবেকানন্দকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় যে স্বামীজি বজবজে পৌঁছানোর পরের দিন বজবজ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হবে। সেই মতো, ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে বিশেষ ট্রেনে করে বজবজ থেকে রওনা হন।
সেদিন প্রায় ২০,০০০ লোকের জনসমাগম, উদগ্রীব চিত্তে শিয়ালদহ স্টেশনে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ইতিমধ্যে, কলকাতার মানুষজন ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রে স্বামী বিবেকানন্দের অবাককরা ভিন্নধর্মী কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়েছিলেন। এছাড়াও, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের বাসিন্দাদের লেখা কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসাপত্রগুলিও পড়েছিলেন, যা ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। এই সবকিছুই জনসাধারণের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দর প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
সকাল ৭:৩০ মিঃ, শিয়ালদহ স্টেশনে মাইকে যখন আসন্ন ট্রেনের ঘোষণা করা হয়, তখন উত্তেজিত জনতার মধ্যে থেকে জয়ধ্বনি উঠতে থাকে, যা চারপাশে প্রতিধ্বনিত হয়। স্বামীজি ট্রেন থেকে নামার সাথে সাথে তাঁর আশেপাশে থাকা প্রত্যেকেই তাঁর আশীর্বাদ লাভের চেষ্টা করেন এবং দূরে থাকা লোকেরা ‘জয় রামকৃষ্ণ পরমহংস জী কি জয়, জয় বিবেকানন্দ জী কি জয়’ স্লোগান ধাক্কা দেন। কোনোরকমে তাঁকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে তোলা হয়। কিন্তু উৎসাহী ছাত্ররা এগিয়ে এসে ঘোড়াকে গাড়ি থেকে সরিয়ে দেয় এবং নিজেরাই গাড়ি টানতে শুরু করে। এরপরেই রঙিন শোভাযাত্রা শহরের রাস্তায় এগিয়ে যেতে থাকে।
স্বামী বিবেকানন্দর কলকাতায় ফিরে আসার এই মহত্মপূর্ণ দিনটি স্মরণ করতে, এখনও প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে, সকালে বজবজ থেকে একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়। এই বছরেও, স্বামীজির কলকাতা প্রত্যাবর্তন দিবসের ১২৮তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে, ১৯ ফেব্রুয়ারী একটি বিশেষ ইএমইউ ট্রেন সকাল ৯:৫৫ মিনিটে বজবজ থেকে ছেড়ে যাবে এবং যাত্রাপথে সব স্টেশনে থামার পর ১০:৫২ মিনিটে শিয়ালদহ পৌঁছবে।
প্রতি বছর কলকাতা প্রত্যাবর্তন দিবসে, বজবজ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত একটি বিশেষ ইএমইউ ট্রেন চালিয়ে পূর্ব রেল স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। বিশ্বব্যাপী ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের প্রসারে তাঁর অবদানের জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বিশেষ ট্রেনটি স্বামীজির কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে এবং তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়।
