ওয়েব ডেস্ক; ২৭ মার্চ : ভারতের বিভিন্ন রেলস্টেশনে নীরবে এক পরিবর্তন ঘটছে, দৈনন্দিন যাত্রাপথের মধ্যেই উঠে আসছে স্থানীয় হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যের পরিচয়। ভারতীয় রেলের ‘এক স্টেশন এক পণ্য’ (OSOP) উদ্যোগ, যা ২০২২–২৩ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে ঘোষণা করা হয়, দেশীয় পণ্যের প্রসারে বিশেষভাবে সহায়ক। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট খুচরো বিক্রয়স্থান তৈরি করে স্থানীয় শিল্পী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG)-কে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, সুস্থায়ী জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরা হচ্ছে।

বর্তমানে, দেশের ২,০০০-এর বেশি রেলস্টেশনে প্রায় ২,৩২৬টি OSOP আউটলেট চালু রয়েছে, যা লক্ষ লক্ষ যাত্রীর সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের সংযুক্ত করছে এবং ১.৩২ লক্ষের বেশি মানুষ উপকৃত হচ্ছেন (১৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত)।

উদ্যোগের সূচনা ও বিস্তার

২০২২ সালের ২৫ মার্চ চালু হওয়া এই উদ্যোগ ভারতীয় রেলের বিস্তৃত নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে স্টেশনগুলিকে সহজলভ্য বাজারে রূপান্তর করছে।

মোট ১৯টি স্টেশনে ১৫ দিনের একটি সফল পাইলট প্রকল্পের পর OSOP ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হয়। অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নামমাত্র ফিতে চক্রাকারে স্টল বরাদ্দ করা হয়।

রেল বিভাগগুলি রাজ্য সংস্থা, SHG এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME)-এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যার ফলে, পরিচালনা সহজ হয়েছে এবং অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন

OSOP-এর অধীনে প্রদর্শিত পণ্যগুলি প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।

তামিলনাড়ুর তেঙ্কাসি জংশনে সূক্ষ্ম বেতের তৈরি সামগ্রী স্থানীয় কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

অন্যদিকে, পাটনা রেলস্টেশনে বিশ্ববিখ্যাত মধুবনী চিত্রকলার প্রদর্শনী স্থানীয় শিল্পীদের বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি

OSOP উদ্যোগে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, শিল্পী, তাঁতশিল্পী, কৃষক, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য, বিশেষত, মহিলা-নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী।

যাদের আনুষ্ঠানিক বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত, তাদের জন্য এই উদ্যোগ নতুন সুযোগ তৈরি করছে। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও প্রচারের মাধ্যমে তৃণমূল স্তরের উৎপাদকরা বৃহত্তর গ্রাহকভিত্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা বজায় রাখতে পারছেন।

আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রদর্শন

OSOP আউটলেটগুলি যাত্রীদের জন্য একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করে, যেখানে তারা স্থানীয় পণ্য স্মারক হিসেবে কিনতে পারেন। এর মাধ্যমে প্রতিটি রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় প্রতিফলিত হয় এবং একই সঙ্গে তৃণমূলের জীবিকাও শক্তিশালী হয়।

আসানসোল রেলস্টেশন,
পশ্চিমবঙ্গ

পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল রেলস্টেশনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটি OSOP কিয়স্কে হাতের কাজের ব্যাগ, হস্তনির্মিত সামগ্রী এবং কার্পেট প্রদর্শিত হচ্ছে, যা অপেক্ষমাণ যাত্রীদের আকর্ষণ করছে।

যাত্রীরা যখন এই পণ্যগুলি ক্রয় করেন, তখন তারা শুধু একটি স্মারক নয়, বরং অঞ্চলের সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের একটি অংশ সঙ্গে নিয়ে যান।

মুর মার্কেট কমপ্লেক্স রেলস্টেশন, চেন্নাই, তামিলনাড়ু

এই স্টেশনে একটি স্টলে তুলোর হাতের তাঁতের পণ্য প্রদর্শিত হয়, যা রাজ্যের সমৃদ্ধ বস্ত্র ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

এই স্টলগুলি যাত্রীদের সহজেই আসল হ্যান্ডলুম পণ্য কেনার সুযোগ দেয় এবং স্থানীয় তাঁতশিল্পীদের সহায়তা করে।

বলাঙ্গির রেলস্টেশন, ওড়িশা

বলাঙ্গির রেলস্টেশনে OSOP-এর অধীনে একটি ছোট খেলনার স্টল স্থানীয় শিল্পী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জন্য নতুন জীবিকার সুযোগ তৈরি করছে।

রঙিন হাতে তৈরি নরম খেলনার স্থানীয় সম্প্রদায়ের সৃজনশীলতাকে ফুটিয়ে তুলেছে, বিশেষত, SHG-র সঙ্গে যুক্ত মহিলারা এখন তাদের পণ্য বৃহত্তর বাজারে সরাসরি বিক্রি করতে পারছেন।

জয়পুর জংশন রেলস্টেশন, রাজস্থান

জয়পুর জংশনে OSOP আউটলেটে রাজস্থানের সাঙ্গানেরী ব্লক প্রিন্টের কাপড়ের ঐতিহ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যাত্রীরা সূক্ষ্ম নকশার কাপড় দেখার জন্য থেমে যান, যা অঞ্চলের সমৃদ্ধ শিল্প ঐতিহ্যের এক ঝলক তুলে ধরে।

এই উদ্যোগ স্থানীয় শিল্পীদের জন্য সুস্থায়ী জীবিকার সুযোগ তৈরি করছে এবং প্রাচীন কারুশিল্প সংরক্ষণে সহায়তা করছে।

টাটানগর রেলস্টেশন, ঝাড়খণ্ড

ঝাড়খণ্ডের টাটানগর রেলস্টেশনে OSOP স্টলগুলিতে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্ম অনেক শিল্পীর জন্য স্থানীয় সীমানার বাইরে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রতিটি ক্রয়-বিক্রয়ই হয়ে উঠছে ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার এক সংযোগসূত্র।

স্থানীয় প্রতিভার জন্য জাতীয় প্ল্যাটফর্ম

OSOP আউটলেটগুলির ক্রমবর্ধমান বিস্তার প্রমাণ করে যে, কিভাবে জনপরিকাঠামো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে পারে।

দৈনন্দিন যাতায়াতের সঙ্গে স্থানীয় পণ্যকে যুক্ত করে এই উদ্যোগ তৃণমূল স্তরের উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করছে এবং ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাকে সংরক্ষণ করছে।

এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, OSOP সাধারণ যাত্রাকে অর্থবহ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করছে।

যাত্রীরা পণ্যের পিছনের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, আর শিল্পীরা পাচ্ছেন স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

এই বিনিময়ের মধ্য দিয়ে রেলস্টেশনগুলি হয়ে উঠছে এমন এক স্থান, যেখানে সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং সমাজ একসূত্রে গাঁথা।

OSOP-এর ক্রমবর্ধমান বিস্তার প্রমাণ করে যে, জাতীয় প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে স্থানীয় প্রতিভাকে কিভাবে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া যায়, যাতে ভারতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তার উৎসস্থলের থেকে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।