কলকাতা, ১৭ এপ্রিল : পরপর দুইবার গর্ভপাতের কষ্টের পর, ৩৪ বছর বয়সী এক মহিলার মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসে এক বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে। ডা. সৌপ্তিক গঙ্গোপাধ্যায়, কনসালট্যান্ট, অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনোকোলজি, তত্ত্বাবধানে জটিল এই গর্ভাবস্থা সফলভাবে শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং জন্ম নেয় একটি সুস্থ কন্যা সন্তান।

গড়িয়ার বাসিন্দা এবং পেশায় ডায়েটিশিয়ান বিদিশা মজুমদারের মাতৃত্বের যাত্রা ছিল বারবার বাধায় ভরা। ২০২৪ সালের শুরুতে তাঁর প্রথম গর্ভধারণ গর্ভপাতের মাধ্যমে শেষ হয়। একই বছরের শেষে তিনি আবার গর্ভবতী হন, কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ১৮–১৯ সপ্তাহে হঠাৎ প্রসববেদনা শুরু হয় এবং জরুরি অবস্থায় তিনি দ্বিতীয়বার সন্তান হারান। এই সময়েই তিনি মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাসে ডা. সৌপ্তিক গঙ্গোপাধ্যায়ের চিকিৎসার অধীনে আসেন।
পরবর্তী পরীক্ষায় জানা যায়, তিনি ‘সার্ভাইক্যাল ইনকম্পিটেন্স’ সমস্যায় ভুগছিলেন। এই অবস্থায় জরায়ুর মুখ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর গর্ভধারণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, ফলে দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে বারবার গর্ভপাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাঁর ক্ষেত্রে এই সমস্যা জন্মগতভাবে সার্ভিক্সের পেশির দুর্বলতার কারণে হয়েছিল।

পুনরায় সন্তান নেওয়ার আশায় দম্পতি তৃতীয়বার গর্ভধারণের পরিকল্পনা করেন এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিদিশা আবার গর্ভবতী হন। আগের ইতিহাস বিবেচনা করে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং ১৩–১৪ সপ্তাহে প্রতিরোধমূলক সার্ভাইক্যাল সারক্লাজ (ম্যাকডোনাল্ড স্টিচ) করা হয়। এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি, যেখানে যোনিপথের মাধ্যমে সার্ভিক্সে সেলাই দিয়ে তা বন্ধ রাখা হয়, যাতে গর্ভাবস্থা নিরাপদ থাকে।

প্রথমদিকে গর্ভাবস্থা স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু প্রায় ২০ সপ্তাহে একটি রুটিন আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা যায়, সার্ভিক্সের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিক ৩.৫–৪ সেমি থেকে কমে প্রায় ১ সেমি হয়ে গেছে। পাশাপাশি অ্যামনিয়োটিক স্যাক সার্ভিক্সের দিকে ফুলে উঠছিল, যা আবার গর্ভপাতের আশঙ্কা তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক দল একটি বিরল ও জটিল ল্যাপারোস্কোপিক রেসকিউ সারক্লাজ করার পরামর্শ দেন। এই পদ্ধতিতে পেটের দিক দিয়ে সার্ভিক্সের উপরের অংশে সেলাই দেওয়া হয়, যা আরও শক্তভাবে গর্ভধারণকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে এটি একটি অত্যন্ত দক্ষতা-নির্ভর এবং ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার, যেখানে রক্তক্ষরণ, রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন এবং চলমান গর্ভাবস্থায় অপারেশনের ঝুঁকি থাকে।

বিস্তারিত আলোচনা ও পরামর্শের পর দম্পতি শেষ ভরসা হিসেবে এই অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ সফলভাবে এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। এরপর রোগীকে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, সম্পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয় এবং প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ভ্রূণের বৃদ্ধি ও গর্ভাবস্থার স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ক্রমশ গর্ভাবস্থা নিরাপদভাবে এগোতে থাকে এবং শিশুর ওজন সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়। কোনও জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকরা নির্ধারিত সময়ে প্রসবের পরিকল্পনা করেন। ২৮ মার্চ ২০২৬ সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বিদিশা প্রায় ২.২ কেজি ওজনের একটি সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও শিশু উভয়েই সুস্থ আছেন।

এই প্রসঙ্গে ডা. সৌপ্তিক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এটি ছিল সার্ভাইক্যাল ইনকম্পিটেন্সের কারণে বারবার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গর্ভপাতের একটি জটিল কেস, যেখানে প্রতিরোধমূলক সারক্লাজও কাজ করেনি। এমন পরিস্থিতিতে ল্যাপারোস্কোপিক রেসকিউ সারক্লাজই একমাত্র কার্যকর উপায়, যদিও এটি ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের হাসপাতালে এই প্রথম এই ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং পূর্ব ভারতে এ ধরনের কেস খুবই কম দেখা যায়। অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সুস্থ শিশুর জন্ম হয়েছে, যা অত্যন্ত সন্তোষজনক।”

নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে রোগীর স্বামী রণিত দাস বলেন, “গত ২–৩ বছর ধরে আমরা চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু দু’বার সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তৃতীয়বার একই সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমরা খুবই চিন্তায় ছিলাম। ডা. সৌপ্তিক সবকিছু পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেন এবং এই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। আমরা চিকিৎসকদের উপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাই। আজ স্ত্রী ও সন্তানকে সুস্থ দেখে খুব ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *