ওয়েব ডেস্ক; ৫ জুলাই : শিক্ষা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন (ডোনার) প্রতিমন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার আইআইটি খড়্গপুরের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সমগ্র পরিবারকে অভিনন্দন জানিয়ে দেশের প্রথম আইআইটিকে ‘সমস্ত আইআইটির জন্মদাতৃ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি ভারতের শিক্ষার ইতিহাস এবং জাতি গঠনের যাত্রায় এই প্রতিষ্ঠানের অনন্য অবদানের কথা তুলে ধরেন তাঁর বক্তব্যে।
আইআইটি খড়্গপুরের ৭২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ড. মজুমদার বলেন, গত ৭৫ বছরে এই প্রতিষ্ঠান আইআইটি আন্দোলনের সূতিকাগার থেকে দেশের অন্যতম প্রধান উদ্ভাবন, উদ্যোগ গঠন এবং শিক্ষাগত উৎকর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম কঠোর শিক্ষাযাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য তিনি স্নাতকদের প্রশংসা করেন এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের দ্রুততম বিকাশশীল বৃহৎ অর্থনীতিগুলির অন্যতম হিসেবে ভারত উদীয়মান প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব সৃষ্টি এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনের জন্য দেশের তরুণ উদ্ভাবক, গবেষক এবং প্রযুক্তিবিদদের উপর আস্থা রাখছে।
জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) ২০২০-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক ও বহুমাত্রিক শিক্ষার মডেলের দিকে রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে উদ্ভাবন, বাস্তব সমস্যার সমাধান এবং আন্তর্জাতিক মানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আইআইটি খড়্গপুরের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী বর্ষে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ৭২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি উচ্চশিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সামাজিক উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানের ৭৫ বছরের অবদানকে স্মরণীয় করে তুলেছে।
নিউ ইয়র্ক অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী আধিকারিক এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের প্রাক্তন চ্যান্সেলর অধ্যাপক নিকোলাস বি. ডার্কস সমাবর্তনে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অতিথি ও মূল বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন এবং কৃষি বিপণন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, এ রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী ড. শাররদ্বত মুখোপাধ্যায়, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শেখর সি. মান্ডে, আইআইটি খড়্গপুরের বোর্ড অফ গভর্নর্সের চেয়ারম্যান টি. ভি. নরেন্দ্রন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপদেষ্টা, ড. সুব্রত গুপ্ত-সহ বহু বিশিষ্ট অতিথি, প্রাক্তনী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক, প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক-সহ একাধিক বিশিষ্ট পুরস্কার প্রদান করা হয়, যা অসামান্য শিক্ষাগত সাফল্য, নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং সর্বাঙ্গীণ উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসাবে দেওয়া হয়েছে। পিএইচডি, এম.টেক, এমবিএ, পিজিডিবিএ, দ্বৈত ডিগ্রি, বি.টেক (অনার্স), চার বছরের বি.এস., দুই বছরের এম.এসসি. সহ বিভিন্ন স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডক্টরাল এবং পেশাদার পাঠ্যক্রমে ডিগ্রি প্রদান করা হয়, যা শিক্ষা ও গবেষণায় প্রতিষ্ঠানের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।
স্নাতকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইআইটি খড়্গপুরের অধিকর্তা অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী বলেন, ২০২৬ সালের স্নাতকরা এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উদ্ভাবন এবং স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তিনি বলেন, অতীতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলি মানুষের সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়েছিল, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) জ্ঞান সৃষ্টি, ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগের মূল ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে।
আইআইটি অধিকর্তা আর-ও বলেন, আইআইটি-র শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কেবল জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিচক্ষণতা, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস গড়ে তোলার মধ্যেই তার স্থায়ী গুরুত্ব নিহিত রয়েছে। তিনি বলেন, তথ্য ও গণনাশক্তি যতই সহজলভ্য হোক না কেন, প্রজ্ঞা, সততা এবং কোন বিষয়টি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা মানুষেরই একান্ত নিজস্ব গুণ হিসাবে থেকে যাবে। তিনি স্নাতকদের আজীবন শিক্ষা, ভুলে যাওয়া এবং পুনরায় শেখার মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমাজের কল্যাণে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি এও উল্লেখ বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ও সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইআইটি খড়্গপুর আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা, অত্যাধুনিক গবেষণা, উদ্ভাবন, উদ্যোগ গঠন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে তার প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রেখেছে।
৭২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠান শিক্ষা, গবেষণা এবং সমাজসেবায় উৎকর্ষ সাধনের প্রতি আইআইটি খড়্গপুরের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। দেশের প্রথম আইআইটি তার প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী বর্ষ উদযাপন করছে এমন সময়ে, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিভা বিকাশ, জ্ঞান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে কাজ করে চলেছে।
