কলকাতা ; ১৯ জুলাই : ভারতের প্রথম ইমারসিভ ভাষা জাদুঘর ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে উদ্বোধন করেন ভারত সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমবায় মন্ত্রী অমিত শাহ। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী; পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাসগুপ্ত; পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গণশিক্ষা সম্প্রসারণ ও গ্রন্থাগার পরিষেবা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী গৌরী শঙ্কর ঘোষ; কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন; ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের সচিব বিবেক আগরওয়াল; ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব (জাদুঘর) লিলি পান্ডেয়া; ভারত সরকারের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক ডঃ মহেশ দীক্ষিত; ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামস-এর মহাপরিচালক কে এস মুরলী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ হলো ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা ভারতের অতুলনীয় ভাষাগত ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য উদযাপনের জন্য উৎসর্গীকৃত। কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার চত্বরের অন্তর্গত ঐতিহাসিক বেলভেডিয়ার হাউসে অবস্থিত এই জাদুঘরটি ভারতের ভাষাগুলির বিবর্তন, বৈচিত্র্য এবং চিরস্থায়ী উত্তরাধিকারের এক গভীর অন্বেষণ উপস্থাপন করে। যত্নসহকারে সজ্জিত নয়টি গ্যালারিতে বিস্তৃত এই জাদুঘরটি প্রায় ৩৮০টি ভাষার ইতিহাস, বিকাশ এবং সমসাময়িক অবস্থা তুলে ধরে। এর মধ্যে ২০১১ সালের ভারতীয় আদমশুমারিতে নথিভুক্ত ১২১টি ভাষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং সেইসাথে এমন অনেক ঐতিহাসিক ভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যেগুলি এখন আর দৈনন্দিন ব্যবহারে নেই। অত্যাধুনিক ইমারসিভ প্রযুক্তি, ইন্টারেক্টিভ ইনস্টলেশন, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এবং প্রত্নবস্তুর এক সমৃদ্ধ সংগ্রহের মাধ্যমে এই জাদুঘরটি ভারতের কথ্য ও লিখিত ঐতিহ্যের অন্যতম একটি বিশদ বিবরণ প্রদান করে।
জাতীয় গ্রন্থাগারের অভ্যন্তরে জাদুঘরটির অবস্থান বই ও পাণ্ডুলিপির সংরক্ষণ এবং ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানের জীবন্ত ঐতিহ্যের মধ্যে এক অনন্য সমন্বয় তৈরি করে। জাতীয় গ্রন্থাগার, যার সূচনা হয়েছিল ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি থেকে এবং যা ১৯৪৮ সাল থেকে বেলভেডিয়ার হাউসে অবস্থিত, এই ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করে।
দর্শনার্থীরা নয়টি বিষয়ভিত্তিক গ্যালারির মধ্য দিয়ে এক মনোমুগ্ধকর যাত্রায় অংশ নেন—প্রথম শব্দ, আমার মাতৃভাষা, নবরস, ভাষার যাত্রা, কিংবদন্তিদের সম্মাননা, মৌখিক ঐতিহ্য, পরিবেশন ঐতিহ্য, বৈশ্বিক সংলাপ এবং গণগ্রন্থাগার আন্দোলন। এই গ্যালারিগুলো একত্রে ভারতের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের এক চিত্তাকর্ষক বিবরণ তুলে ধরে, যা সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার প্রাচীনতম প্রতীক এবং পুনরুজ্জীবিত গুঞ্জালা গোন্ডি লিপি থেকে শুরু করে সহস্রাব্দ ধরে কথ্য ভাষা, লিপি, সাহিত্য এবং যোগাযোগের বিকাশের ধারাকে অনুসরণ করে। এই জাদুঘরটি ভারতের সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধকারী বিশিষ্ট কবি, লেখক, দার্শনিক, পণ্ডিত এবং গল্পকারদের সম্মান জানায়, দেশের প্রাণবন্ত মৌখিক ও পরিবেশন ঐতিহ্যকে উদযাপন করে, বৃহত্তর বিশ্বের সাথে ভাষাগত আদান-প্রদান অন্বেষণ করে এবং জ্ঞান সংরক্ষণ, প্রচার ও গণতান্ত্রিকীকরণে গণগ্রন্থাগারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে।
৪১ কোটি টাকার অনুমোদিত ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আজ ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম তলায় প্রায় ২,২৮২ বর্গমিটার প্রদর্শনী স্থান নিয়ে প্রথম পর্বের উদ্বোধন করা হয়েছে। পরবর্তী পর্বগুলিতে নিচতলায় অতিরিক্ত গ্যালারি, একটি স্যুভেনিয়ার শপ ও ক্যাফে এবং একটি ফাসাদ প্রজেকশন ম্যাপিং প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততার জন্য একটি জাতীয় কেন্দ্র হিসেবে জাদুঘরের ভূমিকাকে শক্তিশালী করবে।
‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’-এর উদ্বোধন ভারতের অতুলনীয় ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ, প্রচার এবং উদযাপন করার প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ধরনের প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের ভাষা, সাহিত্য এবং যোগাযোগের বিবর্তন অন্বেষণের জন্য একটি নিমগ্ন প্ল্যাটফর্ম প্রদান করে, যা দেশের সমৃদ্ধ বহুভাষিক ঐতিহ্যের প্রতি গভীর উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে। ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে, ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ শিক্ষা, গবেষণা এবং জনসম্পৃক্ততার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভারতের ভাষার চিরস্থায়ী ঐতিহ্যকে লালন ও সংরক্ষণ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্স মিউজিয়ামস-এর মহাপরিচালক কে এস মুরলী ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সেই সকলেদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যাঁদের অমূল্য সমর্থন ও অবদান ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’-এর সফল বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ সোমবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি সব দিন সকাল ১০:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে। ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত সকল দর্শনার্থীর জন্য জাদুঘরে প্রবেশ বিনামূল্যে থাকবে।
