দেবাঞ্জন দাস

সবেমাত্র অফিসের গাড়ি টালিগঞ্জে ছেড়ে দিয়ে গেলো। আজ বাড়ি যাব না, বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন আছে। তাই মেট্রো না ধরে হরিদেবপুর- কবরডাঙ্গার অটো ধরবো বলে অটোর লাইনে দাঁড়ালাম। আমার কাঁধে ব্যাগ আর হাতে রয়েছে বন্ধুর মেয়ের জন্য কেনা গিফট। গিফটটা খুবই শৌখিন তাই একটু সামলে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এদিকে আমার আগে কুড়ি জন রয়েছে অটোর লাইনে। মোটামুটি পাঁচটা অটো না গেলে আমার সুযোগ হবে না।

বন্ধুর মেয়ের পাঁচ বছরের জন্মদিন। আমরা দুজন স্কুল থেকে বন্ধু। ওর নিজের কোনো ভাই না থাকায় ওর মেয়ে আমাকে নিজের কাকুর মতোই ভালোবাসে। তাই কাকুর কাছে ওর আবদার একটা সফট টয় আর বেশ কিছু খেলনা। ছোট থেকে দেখছি তাই ওর কোন আবদার আমি ফেলতে পারি না। অন্যদিন আমার বাড়ি ফিরতে ফিরতে মোটামুটি সাড়ে নটা-দশটা হয়ে যায়। এদিন বসকে একটু ম্যানেজ করে টালিগঞ্জ যখন এসে পৌছালাম তখন সন্ধে সাড়ে সাতটা।

দেখতে দেখতে মিনিট দশেক কেটে গেল। তার মধ্যে দুটো অটোও বেরিয়ে চলে গেছে। আমার পেছনে লম্বা লাইন। একটু স্বার্থপরের মত ভাবলাম, তাড়াতাড়ি আরো তিনটে অটো এলে তারপরের অটোতেই আমি চলে যেতে পারব।

এর মধ্যে ওর বাড়ি থেকে তিন থেকে চার বার ফোন এসে গেছে। বাকি বন্ধুরাও এসেছে তাই এত খোঁজ খবর। প্রথমে ভেবেছিলাম আজ অফিস যাবো না। কিন্তু বছর শেষের হিসাব নিকাশ কিছুটা বাকি পড়ে থাকায় যেতে হলো।

জিন্সের প্যান্ট আর নেভি ব্লু রঙের জামা পড়েছি। জামার মধ্যে মধ্যে আবার একটু আঁকিঝুঁকি করা আছে । বেরোনোর সময় সকালে মা বাবাকে বলছিলেন, দেখো ছেলে আবার আজকে কাউকে পছন্দ করে নিয়ে আসে কিনা। আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না।

লাইনে দাঁড়িয়ে আমি বারবার ভাবছি কতক্ষণে আমি ওর বাড়িতে যাব। বন্ধুর মেয়েও দুবার ফোনে কথা বলেছে। অবশেষে আমার আগে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক অটোতে উঠে চলে গেলেন। আর তার প্রায় সাথে সাথেই দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি আমার অটোটা আসছে। মনটা বেজায় খুশি। অটোটা এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি পিছনের সিটে ওঠার জন্য তাড়াহুড়া করলাম।

অটোর পাদানিতে প্রথম পা পড়তে হঠাৎ করে পেছন থেকে একজন মহিলা বলে উঠলেন, “দাদা আমার সাথে আমার ছেলে রয়েছে আমাকে কি একটু পেছনে বসতে দেবেন?” মহিলার গলা বড্ড চেনা লাগলো। মনে হল অনেকদিনের পুরনো গলা আবার শুনলাম। পা যেন আটকে গেল। পেছন থেকে সহযাত্রীরা আওয়াজ দিলেন, “দাদা একটু তাড়াতাড়ি।” আমি ভদ্রমহিলাকে বললাম, ঠিক আছে আপনি পেছনে বসুন, আমি সামনে বসে যাচ্ছি। সবাই অটোতে উঠে পড়লাম। অটো চলতে শুরু করল। বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার সেই তীব্রতা কিছুটা হলেও কমে গিয়ে সেই ভদ্রমহিলার আওয়াজ এখন বারবার কানে বাজছে।

কেইনি ? ওনার আওয়াজ কেন এত পরিচিত লাগছে। আমি সামনের দিকে বসেছিলাম আর উনি বসেছিলেন পিছনের সিটের একদম ডান দিকে, তাই আমার বাঁ দিকে থাকা আয়নায় ওনার মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম। সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে তাই স্পষ্টভাবে মুখটা দেখতে পারছিলাম না। তবুও রাস্তার এবং দোকানের আলো কিছুটা তার মুখে লাগছিল।

যেটুকু তার মুখের আদল দেখতে পাচ্ছিলাম তাতে আমার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। তার ওপর তার সন্তানের সাথে তার কথোপকথন। পেছনে বসে থাকা মহিলার গলার স্বর আরো যেন আমার সন্দেহকে একটু একটু করে সত্যির রূপ দেওয়া শুরু করলো। সেরকম গরম আবহাওয়া না হলেও মাথা থেকে একটা ঠাণ্ডা জলের স্রোত কানের পাশ দিয়ে গলা পর্যন্ত নামছিল।

এই গলার স্বর শেষ শুনেছিলাম ৫ বছর আগে। প্রত্যাখ্যানের একটা সুর এই গলাতেই ছিল। ২১ দশকে এসে উঁচু জাত, নিচু জাত নিয়ে কথা বলেছিল এই গলাতেই। বারবার একটা জিনিস আমি ভগবানের কাছে চেয়েছিলাম যে জীবনে কোনদিন যাতে ওর মুখোমুখি হতে না হয়। কারণ মুখোমুখি হলে তো নিজের দুর্বলতা সামনে চলে আসবে। আমি সেই সময় তাকে আটকে রাখতে পারিনি। তার থেকে বড় কথা আটকে রাখতে চাই নি। কারণ জোর করে তো ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তবে শেষ দিনে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, আমার বিষয়ে কোন কিছুই আমি তোমার কাছে লুকোইনি। তাহলে পাঁচ বছর পর তোমার মনে হল আমি তোমার থেকে নিচু জাতের? সব কিছু কথা ভাবতে ভাবতে আয়না থেকে আমার চোখ সরছে না। আমার সম্পূর্ণ গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে সেই পাঁচ বছর আগে শেষ বারের জন্য দেখা মুখটা আবার আমার সামনে আসতে চলেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। নিজেকে কি করে সামলাবো আমি নিজেই বুঝতে পারছি না।

অবশেষে আমার গন্তব্যে এসে পৌঁছালো আটো। কিছুটা আশা নিয়ে আমি ভাবলাম আর সামনাসামনি নয় এবার আমি এড়িয়ে যাবো। মুখোমুখি হতে হবে না ওর। কিন্তু হঠাৎই পেছন থেকে, ”দাদা সামনে দাঁড়াবেন আমি নামবো”।

আমার মনের মধ্যেই ভয়ের জন্ম নিল। তাড়াহুড়ো করে মানিব্যাগ খুঁজছি আমার জিন্সের পিছন পকেটে। কিন্তু কিছুতেই মানিব্যাগটি খুঁজে পাচ্ছিনা। ততক্ষনে ও নিচে নেমে পড়েছে। ব্যাগটি খুলে টাকা বের করল ভাড়া দেওয়ার জন্য। আমার হঠাৎ করে মনে পড়ল মানিব্যাগটি আমি আমার কাঁধের ব্যাগের সামনের পকেটে রেখেছি। আমি মানিব্যাগটি খুঁজে নিয়ে টাকা বের করতে করতেই অটো চালক বলে উঠলো, দিদি খুঁচরো হবে না। চেনা গলার স্বর আবার বলল, দাদা আমার কাছে এই ১০০ টাকার নোটই আছে। আসলে তাড়াহুড়োর মধ্যে বাপের বাড়ি এসেছি, তাই টাকা খুচরো করার সময় পায়নি। গলাটা বার বার শুনতে শুনতে আমি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লাম। মানিব্যাগ থেকে দুটো দশ টাকার নোট বের করে অটোচালককে দিয়ে বললাম, আমার এবং ওনারটা রাখুন। অটোচালক টাকাটি নিয়ে তার ব্যাগে রেখে দিলেন। আমিও অটো থেকে নামলাম।

ও হাতে ১০০ টাকার নোট ধরে এখনো দাঁড়িয়ে। কিছুটা কৌতূহলবশত বলে উঠলো, আপনি একজন অপরিচিত মানুষ, আমি কেন আপনার কাছ থেকে নেবো আর আপনি বা কেন দিতে গেলেন?

আমাকে ও চিনতে পারেনি। তার কারণ আগে আমি গোঁফ-দাড়ি রাখতাম না এখন আমার চাপ দাড়ি। আমার তো আর কিছুই বলার নেই। শুধু এটুকুই বললাম, আমি সত্যিই অপরিচিত। ৫ বছর আগে দীর্ঘদিনের ভালোবাসা এবং সম্পর্ককে অস্বীকার করে একজন অপরিচিত মতন ব্যবহার করেছিলে। তখনও ছিলাম অপরিচিত আর আজকেও আমি অপরিচিত, আগামী দিনেও আমি অপরিচিতই থাকতে চাই। চলি ভালো থেকো।

একবারের জন্যও সাহস হয়নি পেছন ফিরে তাকানোর, একবারের জন্য সাহস হয়নি দুটো কথা বলার। একবারের জন্য সাহস হয়নি ওর কোলে থাকা ছেলেটিকে আদর করার। কারণ কথোপকথন হলেই যে আমার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। এই দুর্বলতাকে মনের বাইরে এনে কোন লাভ নেই। কারণ এই দুর্বলতা দেখে জগৎ হাসবে, কেউ কাছে এগিয়ে সাহস যোগাবে না।