ওয়েব ডেস্ক : আমরা অধিকাংশ মানুষই দুঃখবাদী, সুবিধাবাদী কিংবা বলা ভালো অসন্তোষবাদী। ‘দাদা কেমন আছেন?’ এই সাদামাটা প্রশ্নটার উত্তরে অধিকাংশ মানুষই ‘এই আছি মোটামুটি,’ ‘কেটে যাচ্ছে কোনওরকমে, “চলে যাচ্ছে,’ অথবা সরাসরি ‘ভালো নেই’ গোছের উত্তর পাওয়া যাবে। ‘ভালো আছি’ বা ‘আমি খুব ভালো আছি’ এরকম উত্তর শতকরা পাঁচভাগ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। অথচ ভেবে দেখলে বলতে হয়, মনুষ্য নামক প্রজাতিটি বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে এই পর্যন্ত অর্থাৎ গত পঁচাত্তর বছর সময়কালটাতে সবচেয়ে সুখে কাটিয়েছে। ঐতিহাসিক কালের মধ্যে পৃথিবী নামক গ্রহটাকে এমন চেটে পুটে ভোগ করতে মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রজাতি পারেনি। এর মধ্যে আমাদের অত্যাচার কত শত প্রজাতি এই গ্রহটা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার খোঁজই রাখি না। কিন্তু নিজেদের সুখ সুবিধায় এতটুকু ব্যাঘাত ঘটলে আমরা গোটা বিশ্বটাকে মাৎ করে দিই।
নিজেদের সুখ সুবিধা বলতে আমরা কী বুঝি? প্রকৃতি যে পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে, তাতেই পৃথিবীর যাবৎ জীবকূল মানিয়ে নিয়ে চলতে বাধ্য হয়। কারণ প্রকৃতির পরিবেশকে পরিবর্তন করে নিজেদের অনুকূল মতো করে নেওয়ার বুদ্ধি বা হিম্মত তাদের নেই। একমাত্র মনুষ্য প্রজাতির তা আছে। পরিবেশকে নিজেদের অনুকূল করতে করতে কতদূর পর্যন্ত গেলে তা প্রকৃতির সহ্যের সীমারেখা অতিক্রম করবে, সেটা আমরা ভালো করেই জানি। কিন্তু আমাদের অসন্তোষের যে কোনও সীমারেখা নেই। তাই এই মনুষ্যজাতি সজ্ঞানে ক্রমশ নিজেদের বাস্তুগ্রহটিকে বিষাক্ত করে চলেছে। প্রথমত জনসংখ্যা এত বিপুল পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছে, যে স্বাভাবিক কারণেই বিশ্বের বাকি প্রজাতিগুলি কোণঠাসা হয়ে গেছে। বেশ কিছু প্রজাতি তো অবলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। আমরা পানীয় জল অপব্যবহার করছি পর্যাপ্ত পরিমাণে। মহাসমুদ্রের জলসম্পদকে উত্যক্ত করে চলেছি। নিরন্তর শ্বাসবায়ুকে বিষাক্ত করে চলেছি অকারণে। আমাদের বাতাবরণকে চৌম্বকজালে আকীর্ণ করে ফেলেছি, যাতে অন্য প্রজাতির নাভিশ্বাস উঠছে। মাটির কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফসল আদায় করতে গিয়ে মাটিকে অনুর্বর আর বিষাক্ত করছি অপরিণামদর্শীর মতো। তাতে হারিয়ে যাচ্ছে কত শত ক্ষুদ্র প্রজাতি। খনিজ পদার্থের আহরণ করতে গিয়ে ভূগর্ভের ভারসাম্যকে পর্যন্ত বিঘ্নিত করে চলেছি। অকারণে শব্দশক্তিকে অসহ্যমাত্রায় নিয়ে গিয়ে স্বজাতি এবং অন্য প্রজাতিকে উত্যক্ত করে চলেছি। নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে এত কিছু করেও আমরা বলতে শিখলাম না ‘আমরা ভালো আছি।’
আসলে আমাদের মানসিকতাটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে শুধু নিজেরা ভালো থাকলেই হবে না। সেই সঙ্গে প্রতিবেশীকে আমার চেয়ে খারাপ থাকতে হবে। তবেই হয়ত কিছুটা উপলব্ধি করতে পারবো, ‘আমি ভালো আছি।’ এটা শুধু ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তা কিন্তু নয়। দেশ তথা জাতির স্বার্থের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর সেই কারণেই প্রত্যেকটি দেশ তাদের ব্যয় বরাদ্দের সিংহভাগ খরচ করে প্রতিরক্ষা খাতে। প্রতিরক্ষা মানে কার থেকে প্রতিরক্ষা? নিজের স্বজাতির কাছ থেকে প্রতিরক্ষা। কারণ আজকের পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র মানুষের শত্রু। শারীরিক শক্তিতে যারা মানুষের শত্রু ছিল তারা আজ মানুষের অনুকম্পার পাত্র। তাহলে স্বজাতিকে বাঁচাবার জন্য এই প্রজাতি কতটা উন্মুখ? তা বোঝা যাবে স্বাস্থ্যখাতে এবং প্রতিরক্ষা খাতে দেশগুলোর ব্যয়বরাদ্দের তুলনা করলে। দেখা যাবে প্রতিটা দেশের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়বরাদ্দ স্বাস্থ্যখাতের তুলনায় বেশ কয়েকগুণ বেশি। হে মানবকুল, তোমরা তো খেয়াল রাখো না, তোমাদের বাড়-বাড়ন্ত একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রকৃতি সহ্য করবে। তারপর তোমাদের ধ্বংস করার জন্য প্রকৃতি নানা উপায় সাজিয়ে রেখেছে। আজকের করোনা ভাইরাস তার সামান্য একটা নমুনা মাত্র। বুদ্ধিবলে এই প্রতিবন্ধকতাকেও মানবকুল অতিক্রমের করতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃতির আস্তিনে আরও কত অস্ত্র লুকানো আছে, তা এই একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তবিদ্যা দিয়েও অনুমান পর্যন্ত করা যাবে না। হয়ত বলবেন করোনা ভাইরাস তো মনুষ্যসৃষ্ট, কিন্তু সে যুক্তি ধোপে টিকবে না। ভাইরাস তো প্রকৃতিরই সৃষ্ট, হয়তো বিজ্ঞান তার কিছুটা পরিবর্তন বা মিউটেশন করাতে পারে। সারা বিশ্বের কেউ অনুমান করতে পেরেছিল এই বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? এমনি করেই প্রকৃতি হয়ত এই বিপুল জনসংখ্যার ভারসাম্যকে নিয়ন্ত্রণ করে নেবে নিজেই। যেমন করে ডাইনোসোরদের ক্ষেত্রে করে নিয়েছিল।
আজ তো পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাণী নীলতিমি বিলুপ্তির পথে। মানুষের ক্ষমতা নেই অবলুপ্তির হাত থেকে তাদের বাঁচাতে। মানুষ ফিরিয়ে আনতে পারবে ডোডো পাখিকে? হ্যাঁ, মনুষ্য নামক প্রজাতির গড়পরতা অপকর্মের কথা বলছিলাম। তাহলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কী কর্তব্য। যাতে অন্তত এই বাস্তুগ্রহটা ভালো থাকবে, তার সঙ্গে বসুন্ধরার সাতশো কোটি ষাটের বাছা। আসুন না আমাদের জীবনধারণের বাহ্যাড়ম্বরটা কমিয়ে ফেলি। ন্যূনতম উপাদানটুকু গ্রহণ করে আমরা জীবনধারণ করি। প্রশ্ন সেটা কেমনভাবে? করোনাকালে একমাস গৃহবন্দি থেকে আমরা তো সবকিছু প্রয়োজন মতো পাচ্ছিলাম না। তাতেও তো বেশ চালিয়ে নিচ্ছিলাম। এটাকেই অভ্যাস করে তুললে কেমন হয়। যা হাতের কাছে পাওয়া যাবে তাতেই আমরা সন্তুষ্ট থাকবো। সামর্থ্য থাকলেই অতিরিক্ত সৌখিন জিনিস যেটা পাওয়া যাছে না, তারজন্য হন্যে হয়ে প্রচেষ্টা চালাবো না। সেই একমাসে আমাদের প্রসাধনী, অতিরিক্ত সাজপোশাক, বিলাসদ্রব্য এসব জিনিস না পেলেও তো আমরা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। যাকে বলে বাহুল্যবর্জিত জীবনচর্যা।
একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। এই সময়টাতে অধিকাংশ ডাক্তারবাবুরা তাঁদের চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যাঁরা চেম্বার খুলেছেন তাঁদের কাছেও রোগীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। তাহলে করোনা নামক রোগটার ভয়ে কি অন্য রোগগুলো পালিয়ে গেল? তা নয়, আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে সামান্য কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। আমাদের অধিকাংশ ছোটোখাটো রোগ নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু আমাদের সহনশীলতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। সামান্য কাটা ছেঁড়া ব্যথা বেদনা জ্বর সর্দি কাশিতে একটুও সহ্য করবো না। নিজের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখবো না। প্রাকৃতিক নিরাময়ের সুযোগ দেবো না। দৌড়াবো ডাক্তারের কাছে।
বর্তমানের অধিকাংশ ডাক্তারবাবু রোগ নির্ণয় করে তার চিকিৎসা করেন না। প্রেসক্রিপশনে রোগের নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করেন না। শুধমাত্র রোগের লক্ষণগুলোর নিরাময়ের ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেন। তাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ খেতে হয়। সেগুলো রোগীর দেহে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, দেহের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এমনকি রোগটা পর্যন্ত নির্মূল হয় না। করোনা কালের সময়টাতে মানুষ নিরুপায় হওয়ায় এই ধরনের রোগগুলো আপনা থেকেই উপশম হচ্ছিল। চিকিৎসকরা চিকিৎসাটাকে ব্যবসা হিসেবে যতটা নেন, সেবা হিসেবে ততটা নেন না। তাছাড়া ডাক্তারদের রোগ নির্ণয় করার ক্ষমতাটাও তলানিতে এসে ঠেকেছে। সবটাই পরীক্ষা নির্ভর। কিন্তু সেই পরীক্ষাতেও তো গলদ। পাঁচ জায়গায় পরীক্ষা করালে পাঁচ রকম রিপোর্ট। অনেকে হয়ত বলবেন রোগীদেরও দোষ আছে। তাদের ধৈর্য নেই। অথবা রোগীরা ডাক্তারদের উপর খড়্গহস্ত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রেও বলতে হয় ডাক্তারকেও রোগীর বিশ্বাসটা অর্জন করতে হবে। তাছাড়া ডাক্তাররাও তো মানুষ, ভুল হতে পারে, কিন্তু তাঁদের তো মানবিক হতে হবে।
যাকগে কথায় কথায় মূল জায়গা থেকে সরে এসেছি। প্রসঙ্গটা হল আমাদের প্রাথমিক চাহিদা বিষয়ে। জনগণের সহিষ্ণুতা একটু বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা অনেক কমে যায়। আসল কথাটা হল কতটুকু চাহিদা পুরণ হলে ‘আমরা ভালো আছি’ এটা উপলব্ধি করতে পারবো? মানুষ ভালো থাকার কথা বলতে গেলেই অতীত খুঁড়তে শুরু করে। আগে আমরা বেশ ভালো ছিলাম, এখন আর সেই সুখ নেই ইত্যাদি। কিন্তু সেই ‘আগের’ সময় যখন বর্তমান ছিল, তখন কিন্তু তিনি উপলব্ধি করতে পারেন নি যে, ‘তিনি ভালো ছিলেন।’ অর্থাৎ বর্তমানটা পার না হওয়া পর্যন্ত আমরা উপলব্ধি করতে পারি না, যে আমরা ভালো আছি। হ্যাঁ, অতি সংবেদনশীল মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে অধিকাংশ গৃহস্থ মানুষই তো বেশ আছেন। তাঁরা অন্তত উপলব্ধি করুন, আমি অনেকের চেয়ে ভালো আছি। তাঁরা নিজেদের কর্তব্যটুকু যথাযথ পালন করে অন্তত এই লড়াইয়ে নিজের ভূমিকাটুকু সুষ্ঠুভাবে পালন করুন।
আমি আশাবাদী মানুষ হিসেবে আশা করছি, এই নীল গ্রহটাকে বাঁচাবার লড়াইয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমরাও নীরবে যোগদান করবো।
