ওয়েব ডেস্ক; ১৪ সেপ্টেম্বর : বড়দের আলোচনা চলছে। আর সভাকক্ষের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে খেলছে দুই শিশু। দেখে বোঝার উপায় নেই, মাত্র গত সপ্তাহেই জলে ডুবে গিয়েছিল তারা। সময়মতো উদ্ধার ও জীবনরক্ষাকারী সহায়তায় দু’জনেই বেঁচে ফিরেছে। বৃহস্পতিবার ময়নার বিডিও অফিসে জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষ বৈঠকে মায়ের সঙ্গে এসেছিল সেই দুই শিশু।

সকলের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মা শোনান সন্তানদের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার কথা। দুই শিশুকে ফের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে দেখে স্বস্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ে সভাকক্ষে। কিছু ক্ষণ পরেই অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য ছবি। কিছু দিন আগে জলে ডুবে নাতিকে হারিয়েছেন এক ঠাকুমা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নিস্তব্ধ হয়ে যায় সভাকক্ষ। আবেগ ছুঁয়ে যায় উপস্থিত প্রশাসনিক আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধিদেরও। একই ঘরে ফিরে পাওয়া দুই শিশুর হাসি আর সন্তান হারানো একটি পরিবারের যন্ত্রণা যেন বুঝিয়ে দিল, জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের কাজ কেন এত জরুরি।

জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে রেখে এ দিনের বৈঠকের আয়োজন করে ময়না ব্লক প্রশাসন। চাইল্ড ইন নিড ইনস্টিটিউট (সিনি) এই উদ্যোগে কারিগরি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়। ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি, গ্রাম পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্য, পুলিশ, সুসংহত শিশু বিকাশ পরিষেবা (আইসিডিএস), স্কুল শিক্ষা-সহ বিভিন্ন দফতর এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের একই মঞ্চে আনার বিষয়টিই এ দিনের বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্য দেয়। কর্মসূচিতেও এই আন্তঃদফতরীয় অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ময়নার বিডিও জগন্নাথ বিশ্বাস, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি গৌতম গুরু, সহ-সভাপতি পঞ্চানন মণ্ডল, জেলা পরিষদ সদস্য অভিজিৎ অধক, বিডিএমও সোমনাথ সামন্ত, এএসআই ঈশ্বর সিংহ, সিনি-ময়নার পরিচালন সমিতির সদস্য অবিনাশ গায়েন, জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে রাজ্যের পরামর্শদাতা দলের সদস্য ডা. পার্থ সারথি গিরি এবং সিনির জাতীয় অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান সুজয় রায়। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দফতরের প্রতিনিধি, আশা কর্মী, শিশু সংসদের সদস্য এবং স্থানীয় মানুষও আলোচনায় যোগ দেন।

জেলা প্রশাসন স্তরেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) সমরজিৎ চক্রবর্তী বৈঠকে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। জরুরি প্রশাসনিক কাজের কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও, আগামী দিনে জলে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে এ ধরনের উদ্যোগ আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এ দিনের বৈঠকে আলোচনার পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হয় হাতে-কলমে জীবনরক্ষার কৌশলেও। জলে ডোবার পরে শরীরে কী ঘটে, কেন প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত কী ভাবে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দেওয়া যায়, তা সহজ ভাষায় তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞেরা। স্বাতী গোস্বামী ও আশা কর্মীরা জীবনরক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা ও বুকে চাপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরিয়ে আনার পদ্ধতি দেখান। সিভিল ডিফেন্সের স্বেচ্ছাসেবকেরা দেখান নিরাপদে জল থেকে উদ্ধারের কৌশল।

রাজ্যে জলে ডুবে মৃত্যুর পরিস্থিতি, স্থানীয় ঝুঁকি এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধমূলক কাজের অভিজ্ঞতাও আলোচনায় উঠে আসে। তবে এ দিনের বৈঠকের মূল সুর ছিল স্পষ্ট জলে ডুবে মৃত্যু ঠেকানোর দায়িত্ব কোনও একটি দফতর বা সংস্থার একার নয়। প্রশাসন, পঞ্চায়েত, স্বাস্থ্য, পুলিশ, আইসিডিএস, শিক্ষা দফতর এবং স্থানীয় মানুষকে একসঙ্গে নিয়েই এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় ও এলাকা চিহ্নিত করা, শিশুদের সুরক্ষা, উদ্ধার ও জীবনরক্ষাকারী প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় স্তরে সচেতনতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। তবে দীর্ঘ কর্মপরিকল্পনার চেয়েও এ দিনের বড় প্রাপ্তি ছিল সমন্বিত ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার। জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েতের জনপ্রতিনিধি থেকে ব্লক প্রশাসন, স্বাস্থ্য, পুলিশ, আইসিডিএস, শিক্ষা দফতর, সিনি এবং স্থানীয় মানুষ—সকলেই আগামী দিনে হাতে হাত মিলিয়ে জলে ডুবে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানোর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *