ওয়েব ডেস্ক; ২৭ সেপ্টেম্বর: “ভারত শান্তিতে বিশ্বাসী এবং কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল করতে চায় না। তবে শান্তিকে যেন দুর্বলতা বলে ভুল না করা হয়। আমরা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা চাই, কিন্তু তা আমাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিনিময়ে নয়। কোনো হুমকি দেখা দিলে আমাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,” – ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে নতুন দিল্লিতে আয়োজিত একটি প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ভাষণদানকালে একথা বলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনার কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। “যেসব দেশ সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় ও সহায়তা দেয়, তাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে কোনো জাতির জন্য সন্ত্রাসবাদ কৌশলগত সম্পদ হতে পারে না।” সাম্প্রতিক এসসিও বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্তব্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, যতক্ষণ কোনো প্রতিবেশী দেশ সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনের নীতি বজায় রাখবে, ততক্ষণ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার ভারতের রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের নিরাপত্তা কেবল সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব নয়, বরং তা প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। তিনি নাগরিকদের ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল ও অন্যান্য পরিচয়ের ভিত্তিতে সৃষ্ট বিভেদ ভুলে ব্যক্তিগত ও সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাজনাথ সিং ভারতকে একটি ‘সভ্যতা-ভিত্তিক শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন, যার উত্থান সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তিনি ভারতের কর্মপদ্ধতির তিনটি ভিত্তি – দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ও সভ্যতার ঐতিহ্য, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর নীতি ও ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর দৃষ্টিভঙ্গি – এবং পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভ – সম্মান, সংলাপ, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি – তুলে ধরেন।
‘গ্লোবাল সাউথ’-এর ওপর আলোকপাত করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী একটি বিশ্বস্ত অংশীদার এবং ‘বিশ্ব বন্ধু’ হিসেবে ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ কর্মসূচির আওতায় ভারত ১০০টিরও বেশি দেশকে ৩০ কোটিরও বেশি কোভিড-১৯ টিকার ডোজ সরবরাহ করেছে এবং ওষুধ, ডিজিটাল পেমেন্ট সমাধান, দক্ষতা ও সম্পদের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করেছে। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ‘ভয়েস অফ গ্লোবাল সাউথ সামিট’-এর মতো উদ্যোগগুলোর কথাও তুলে ধরেন। ক্ষমতার দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে তিনি প্রতিযোগিতার মধ্যেও পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক উন্নয়নে সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
রাজনাথ সিং প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের স্বনির্ভরতা অর্জনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারত বিমান ও ড্রোনের ইঞ্জিন থেকে শুরু করে পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পর্যন্ত দেশীয় প্রযুক্তিতে সক্ষমতা গড়ে তুলছে। ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২০১৩-১৪ সালের মাত্র ৬৮৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে রেকর্ড ৩৮,৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং তা এখন ১০০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গত বছর ৩০,০০০ কোটি টাকার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর, ভারত এখন ২০২৯ সালের মধ্যে ৫০,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, গোলাবারুদ এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রতি ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদা ভারতের প্রযুক্তি, গুণমান এবং সরবরাহ সক্ষমতার ওপর বিশ্বব্যাপী আস্থারই প্রতিফলন। ফলে, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বিষয়টি কেবল একটি উৎপাদন-সংক্রান্ত পরিচিতি বা লেবেল হিসেবে নয়, বরং ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর আস্থার প্রতীক হিসেবে ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন; ২০১৩-১৪ সালে যেখানে এই বরাদ্দ ছিল প্রায় ২.৫৩ লক্ষ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৬-২৭ সালে তা বেড়ে ৭.৮৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১.৩৯ লক্ষ কোটি টাকার মূলধনী সংগ্রহের বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশই দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট এমএসএমই সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করছে।
রাজনাথ সিং বলেন যে যুদ্ধের প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; আধুনিক সংঘাত এখন প্রথাগত ক্ষেত্রের গণ্ডি পেরিয়ে সাইবার, মহাকাশ, ইলেকট্রনিক ও তথ্য যুদ্ধের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং হাইপারসনিক সিস্টেমের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি এই ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের ভবিষ্যৎ-উপযোগী সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
প্রযুক্তি, জ্বালানি, ডেটা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো ক্ষেত্রে কৌশলগত দুর্বলতা দূর করার লক্ষ্যে ভারতের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান যে, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আত্মনির্ভরশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, সশস্ত্র বাহিনীর জারি করা পাঁচটি ‘পজিটিভ ইন্ডিজেনাইজেশন লিস্ট’ বা দেশীয়করণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৫০৯টি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, অস্ত্র ব্যবস্থা এবং প্ল্যাটফর্মকে। এছাড়া, প্রতিরক্ষা খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি ৫,৪১৭টি সামগ্রী নিয়ে ছয়টি দেশীয়করণ তালিকা প্রকাশ করেছে – যার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলআরইউ, সাব-সিস্টেম, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৩,৩০০টি সামগ্রী ইতিমধ্যেই দেশীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বেসরকারি খাত, স্টার্টআপ এবং এমএসএমই-র ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। ভারতের প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেমে এখন ডিপিএসইউ, বেসরকারি শিল্প, ১৬,০০০-এরও বেশি এমএসএমই, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে উঠছে। উত্তর প্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর প্রতিরক্ষা শিল্প করিডোরগুলিতে প্রায় ৭০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে এবং ইতিমধ্যেই প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী দেশীয় প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ‘সৃজন’ এবং ‘সৃজন দীপ’ পোর্টালের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি জানান যে, ‘সৃজন’-এর মাধ্যমে আমদানিকৃত প্রায় ৩৩,০০০ পণ্যকে দেশীয় উৎপাদনের আওতায় আনার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ১৫,৭০০টি পণ্যের দেশীয় উৎপাদন শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ‘সৃজন দীপ’ ৪০,০০০-এরও বেশি নির্মাতা ও বিক্রেতা এবং লক্ষ লক্ষ পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় ডিজিটাল ডেটাবেস গড়ে তুলেছে।
রাজনাথ সিং ডিপিএসইউ এবং অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বা সমরাস্ত্র কারখানাগুলোর কর্মপদ্ধতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিগুলোকে কর্পোরেট কাঠামোর আওতায় আনার ফলে সেগুলোর প্রযুক্তি-নির্ভরতা, উৎপাদন ক্ষমতা এবং দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে ১৬টি ডিপিএসইউ-ই কোনো প্রকার লোকসান ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং গবেষণা, উন্নয়ন ও রপ্তানির ওপর অধিকতর মনোযোগ দিচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম ও উদ্ভাবনের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন যে, iDEX এবং iDEX-Prime স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকদের জাতীয় নিরাপত্তায় অবদান রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে; পাশাপাশি এডিআইটিআই-র মতো কর্মসূচিগুলো উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিকাশে সহায়তা করছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত iDEX-এর মাধ্যমে ৬৭৬টি স্টার্টআপ ও উদ্ভাবককে যুক্ত করা হয়েছে এবং ৫৫১টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া, মন্ত্রক স্টার্টআপ ও এমএসএমই-গুলোর কাছ থেকে ২,৪০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের পণ্য সংগ্রহের এবং ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে।
একটি উল্লেখযোগ্য ঘোষণা ছিল প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য ডিআরডিও-র উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যোগ্য ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত, যার ফলে উপযুক্ত বেসরকারি কোম্পানিগুলো এগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। শ্রী রাজনাথ সিং বলেন, এই পদক্ষেপ সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সময়মতো ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ডিআরডিও-কে এখন মূলত গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে, আর উৎপাদনের ক্ষেত্রে শিল্পখাত আরও বড় ভূমিকা পালন করছে।
পরিশেষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ভারতের লক্ষ্য হলো প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিটি স্তরে – ছোট যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থা পর্যন্ত – দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশেই প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করা এবং একটি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক দেশীয় প্রতিরক্ষা-শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
