ওয়েব ডেস্ক ; ৯ এপ্রিল : প্রকৃতির বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জীববৈচিত্রের সুর যেন এক মহাকাব্য! কিন্তু সেই কাব্যের ছন্দ পতন ঘটে যায় এক অচেনা চরিত্রের অনুপ্রবেশে–“আগ্রাসী এলিয়েন প্রজাতি!”
“এলিয়েন” – শুনলেই মনে ভেসে ওঠে কল্পবিজ্ঞানের সৃষ্টি বিভিন্ন রকম চরিত্রের ছবি, যাদের অনুপ্রবেশে শংকা জাগায় মানুষের মনে! ধীরে ধীরে শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি- ইতিহাসের পাতায় বেঁচে থাকার লড়াই! প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় নাহলে বহিঃশত্রুর অনুপ্রবেশ রাজ্যকে কিভাবে সর্বস্বান্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে, তার দৃষ্টান্ত আমরা বারবার দেখেছি অতীতে- নাদির শাহ, চেঙ্গিস খান, মোঘল ইত্যাদি জাতির অনুপ্রবেশের ফলে।
এই আগ্রাসী এলিয়েন প্রজাতির গল্প বাস্তব প্রকৃতির চিত্রপটে অনেকটাই কল্পবিজ্ঞান অনুসৃত। একটি স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রে কিন্তু ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী অতিথিরূপে প্রবেশ করে- ধীরে ধীরে তাদের দখলদারি স্থানীয় জৈববৈচিত্র্যে এতটাই প্রভাব ফেলে যে দৈনন্দিন খাদ্য, বাসস্থানের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়তে পড়তে একসময় পরিবেশের বুক থেকেই হারিয়ে যেতে পারে। এই আগ্রাসী এলিয়েন প্রজাতি শুধুমাত্র স্বাভাবিক নিয়মে একটি বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করেনা। ‘হিউমান ইন্টারভেনশন ‘ বা মানুষের হস্তক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, কখনো স্বেচ্ছায় কখনো অনিচ্ছায় আবার কখনো দুর্ঘটনায় একটি আগ্রাসী প্রজাতি তার স্বাভাবিক বাসস্থান ছেড়ে অন্য বাস্তুতন্ত্র বা ভিন্ন দেশে পারি জমায় এবং ধীরে ধীরে তার আগ্রাসী প্রভাব বিস্তার করে।
বন্যপ্রাণী জগতেও এমন অনুপ্রবেশ ঘটলে সংঘর্ষ অনিবার্য। এবং জয়ী প্রাণীটি বিজিত প্রাণীটিকে তাড়িয়ে দেয় বা মেরে ফেলে। এরকমই এক বিধ্বংসী কীট প্রজাতি হল “স্মল হাইভ বিটল” বা “ছোট চাকপোকা”। এর বৈজ্ঞানিক নাম- এথিনা টুমিডা (Aethina tumida)। এটি “কোলিওপটেরা” বর্গের “নিটিডিউলিডি” গোষ্ঠী অন্তর্গত একটি কীট প্রজাতি যেটি মৌমাছিদের শত্রু এবং মৌচাকের ক্ষতি করে। এটি বিশ্বব্যাপী মৌচাষ শিল্পের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্বেগজনকভাবে এই ভয়ঙ্কর বিটল প্রজাতিটি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে! সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার আমডাঙ্গা অঞ্চলের একটি মৌমাছি পালন কেন্দ্রে এই প্রজাতির উপস্থিতি প্রথম নজরে পড়েছিল জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তরুণ বিজ্ঞানী ডঃ ঝিকমিক দাশগুপ্তর। এই সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি “জার্নাল অফ এনভারমেন্ট এন্ড সোশিওবায়োলজি” Journal of Environment and Sociobiology গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়। ডঃ দাশগুপ্ত সতর্ক করেছেন যে, এই ছোট চাকপোকা মৌচাষের সাংঘাতিক ক্ষতি করতে পারে কারণ, প্রজাতিটি খুব দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমানে, পতঙ্গ জগতেও এই আশ্চর্য অনুপ্রবেশ এবং তার অনিবার্য পরিণতি আবিষ্কার করে পতঙ্গের কার্যকলাপ এবং তাদের ধ্বংসলীলা দেখে বিজ্ঞানীদের কপালের ভাঁজ গভীর হয়েছে।
১৮৬৭ সালে সাব-সাহারান আফ্রিকায় আবিষ্কৃত হওয়ার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৯), নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া (২০০২), কানাডা (২০০৭), ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ (২০১০), দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল (২০১৫), এশিয়ার ফিলিপিন্স (২০১৬), চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়া (২০১৭) –এ এই চাকপোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। অবশেষে, ভারতও এই পোকার বিস্তার থেকে মুক্ত থাকতে পারল না। অনুকূল পরিবেশগত অবস্থার কারণে, ভারতবর্ষের মতো দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে এই পোকা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি প্রাপ্তবয়স্ক চাকপোকা প্রায় ৫ থেকে ৭মি.মি লম্বা, লাল চেবা দামি রংয়ের, ডিম্বাকৃতি চেহারার হয়। স্ত্রী চাকপোকা মৌচাষ বাক্সের ফাটলের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর পোকার ছোট লার্ভা মৌমাছিদের সঞ্চিত পরাগরেণু, মধু, মৌমাছির ডিম ইত্যাদি খেয়ে ফেলে এবং মৌচাকের মধ্যেই মলত্যাগ করে। এরফলে, মধু অরুচিকর এবং মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। মৌমাছিরা যখন ওদের তাড়াতে যায়, ওরা তখন সাময়িকভাবে মৌচাষ বাক্সের ফাটলের মধ্যে বা খোপগুলির মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। চাকপোকাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মৌমাছিরা অনেকসময় মৌচাক ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিশ্বপ্রাণী স্বাস্থ্যসংস্থা এটিকে ‘রোগবিজ্ঞপ্তিযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এরা একের পর এক মৌচাক লুটে নিচ্ছে আর মৌচাকের সংগৃহীত মধুর ঘনত্ব কমিয়ে তরল করে দিচ্ছে। এর আক্রমণে মৌচাকের মধু নিকৃষ্টমানের হয়ে যাচ্ছে,, যার ফলে, মৌচাষীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে চলেছে।
কিভাবে এই চাকপোকার দখল থেকে মৌমাছি ও মৌচাকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ বিজ্ঞানীদের কাছে এখন। ডঃ ঝিকমিক দাশগুপ্ত এই ভয়ঙ্কর পোকার নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি “জৈবনিরাপত্তা” ব্যবস্থা তৈরির আশায় এর জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলি নিয়ে গবেষণা করছেন যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতেপারে অদূর ভবিষ্যতে।
