ওয়েব ডেস্ক; ডা: চন্দ্রগুপ্ত : নিজের ভাষাকে ভালোবেসে আমরা আমরা অনেকেই অনেক কিছু করে থাকি। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকে যেন নিজেদের শয়ন-স্বপন- জাগরণে একাত্ম করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের সিনেমা গুলো যেন এক একটি জীবনের জীবন্ত দলিল। সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে যত সিনেমা রিলিজ হয়েছে বাংলাদেশে প্রায় সমপরিমাণ সিনেমা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে গুণগত মান হিসেবে বিচার করলে আমাদের এখানকার তৈরি ছবিগুলোর মাত্র ৩০ শতাংশ গল্প, সিনেমা তৈরির কুশলতা, সম্পাদনা অথবা তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মানুষের নজর কাড়ে এবং অন্তরে রেখাপাত করে। অন্যদিকে যদি বাংলাদেশের সিনেমা গুলো দেখি, তাহলে দেখা যাবে তাদের গল্পগুলো সব সময় একটা নতুন মাত্রা রেখে দেয়। সেটি তৈরির কুশলতা এবং ক্যামেরার ফ্রেম একটা নতুন দিক নির্দেশ করে, প্রাসঙ্গিক লোকেশন দর্শকদের মনোসংযোগ বাড়িয়ে দেয় সিনেমার প্রতি।

এমনিতেই নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশে সবুজের আধিক্য বেশি আর তাকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সিনেমার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকে। করবেই বা না কেন? সম্পদ যখন আমার ঘরেই আছে, তখন আমরা বাইরে কেন যাব!! পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা গুলোতে এখন বিদেশে কিছু অংশের শুটিং না করলেই চলে না। তা সে গল্পের প্রয়োজনই হোক, অথবা ব্যবসায়িক কারণে হোক। আদতে কিন্তু সেটি বক্স অফিসে হিট করলো কিনা সেটিই বড় কথা।

বাংলাদেশের একটি সিনেমা ‘আয়নাবাজি’ তে সফল অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীকে অন্য একটি মাত্রার অভিনেতা হিসেবে আমরা দেখতে পাই। কিভাবে অভিনয়কে গল্পের নায়ক করা যায় লেখক সেটি করে দেখিয়েছেন। গল্পের গতি এমনভাবে চলেছে যেন প্রতিমুহূর্তেই বলছে মন এবার তাহলে কি হবে। আবার যদি দেখি ‘মহানগর’ ওয়েব সিরিজ, যেখানে জনপ্রিয় টিভি তারকা মোশারফ করিম মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করছেন। কি অসাধারণ অভিনয়ে কুশলতা, কি অসাধারণ গল্পের বাঁধন। কখনোই মনে হচ্ছে না যে একটি ওয়েব সিরিজের মধ্যে আমরা রয়েছি। যেন মনে হচ্ছে বাস্তব আমাদের সামনে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের মনকে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছি।

অনেকদিন আগে তৈরি হওয়া একটি সিনেমা ‘ডুব সাঁতার’, সেখানে মহসিন ম্যাডামকে যেন মনে হচ্ছিল আমাদের ঘরের একজন মেয়ে। নিজেদের নদীমাতৃক দেশ হওয়ার সুবিধাটাকে হাতিয়ার করে নদীর উপরেই শুটিংগুলো সম্পন্ন করেছেন পরিচালক।

এছাড়াও বাংলাদেশের ‘বন্ধু’, ‘মুখোশ’, ‘প্রাক্তন’ প্রভৃতি সিনেমাগুলো যেন একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা মিশো সাবলীল ভাবে বিভিন্ন সিনেমা ও নাটকে অভিনয় করে যেমন বাংলাদেশের দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন, তেমনি বাংলা ভাষাভাষী অন্য দেশের মানুষদেরও মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

আসল বিষয় হচ্ছে গল্প নির্বাচন। যে গল্পে রগরগে গান এবং নাচের দৃশ্য না রেখেও অসাধারণ কিছু করা যায় তার নিদর্শন বারবার প্রমাণ করছে আমাদের এই প্রতিবেশী দেশ।

টলিউড এ কিন্তু এখনও সেই আগের মানসিকতা কাজ করে চলেছে। যারা ডিস্ট্রিবিউশনের কাজ করছেন তারাই করবেন। যারা পরিচালনা করে এসেছেন তারাই করবেন। যারা গল্প লিখছেন, চিত্রনাট্য লিখছেন তারাই লিখবেন। ফলে গল্প বা সিনেমা নির্মাণ এর মধ্যে কিন্তু বৈচিত্র আসতে পারেনি।

এই বৈচিত্র না আনতে পারলে বলিউডের মত অবস্থা হবে। কারণ বলিউড কিন্তু এখন বারবার ধাক্কা খাচ্ছে দক্ষিণে নির্মিত সিনেমা গুলোর কাছে। দক্ষিণের সিনেমা গুলো যেমন তাদের গল্প এবং নির্মাণের কুশলতায় অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, তেমনি তাদের সিনেমার বিক্রি এবং লাভ অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আর সে কারণেই কি রিমেক এর দিকে এগিয়েছে বাংলা সিনেমা??? নতুন গল্প কি নেই, নতুন লেখক কি বাংলায় তৈরি হয়নি, নতুন পরিচালকেরা কি ভালো সিনেমা বানাতে পারছেন না!!

না পারছেন। কিন্তু তাদের এগোতে দেওয়া হচ্ছে না। কিছুদিন আগে টলিউডের এক প্রবীণ অভিনেতা এখানকার নোংরা রাজনীতির কথা বলেছিলেন। সেটি সামাজিক মাধ্যমে আসার পরেও বিষয়গুলো পাল্টে যায়নি। এখনও নতুন প্রযোজক বা পরিচালক যদি কোন সিনেমা তৈরি করেন তবে সেটি ডিস্ট্রিবিউটরের অভাবে বাজারে আসার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে যায় নতুন প্রযোজক এবং পরিচালক সিনেমা তৈরির থেকে পিছিয়ে আসেন, থেকে যায় সেই পুরানোরা।

কবে পাল্টাবে টলিউডের এই ঘুনে ধরা অলিখিত নিয়ম? বারবার গিল্ড আর ফোরাম করে কমিটি তৈরি হতে পারে। কিন্তু ভালো সিনেমা তৈরি করা অসম্ভব। তাই এবার পাল্টে ফেলুন পুরনো চিন্তাভাবনা। শুরু হোক দুই বাংলায় ভালো সিনেমা তৈরি এক সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা।