ওয়েব ডেস্ক; ১৩ নভেম্বর : প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর শিশু দিবস ও বিশ্ব ডায়বেটিস দিবস একসাথে পালিত হয়। এটাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আজকের দুনিয়ার শিশুদের স্বাস্থ্য ক্রমশ কোন কোন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এই দুটো দিবসের সমাপতন এখন আর স্রেফ প্রতীকী নয়। শিশুদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ডায়বেটিস এবং স্বাস্থ্য ও দৃষ্টিশক্তির উপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এই দিনটা এক সতর্কবাণী।
গত এক দশকে জীবনযাত্রার দ্রুত বদল শৈশব ব্যাপারটাকেই আমূল বদলে দিয়েছে। স্ক্রিনে বেশি সময় কাটানো, বাড়ির বাইরে খেলাধুলোর সময় কমে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান বসে বসে কাজকর্ম করার রুটিন স্বাস্থ্যের উপর চোখে পড়ার মত প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। প্রোসেসড খাবার, অসময়ে খাওয়াদাওয়া এবং মিষ্টি পানীয় দ্বারা চালিত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পরিস্থিতি আরও খারাপ করে ফেলেছে।

ডাঃ অরুণ সাংভি, চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর, এএসজি আই হসপিটাল, বললেন “কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি যে খেলার মাঠের জায়গা নিয়ে নিয়েছে স্ক্রিন টাইম আর দৌড়াদৌড়ি করে খেলাধুলো করার জায়গা এসে পড়েছে বসে বসে কাজকর্ম করার রুটিন। অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে ডায়বেটিস সমেত জীবনযাত্রা সংক্রান্ত সমস্যা দৃশ্যত বেড়ে গেছে।”
ভারত ইতিমধ্যেই বিশ্বের ডায়বেটিস রাজধানী হিসাবে পরিচিতি পেয়ে গেছে। তার উপর শিশুদের ডায়বেটিসের ঘটনা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া গভীর চিন্তার বিষয়। অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া এবং সীমিত শরীরচর্চা টাইপ ১ আর টাইপ ২ – অল্প বয়সে দুরকম ডায়বেটিস হওয়ার ঝুঁকিই বাড়িয়ে তুলছে।

ডাঃ সাংভি ব্যাখ্যা করলেন “বাবা-মা হিসাবে, প্রশিক্ষক হিসাবে এবং পরিচর্যাদানকারী হিসাবে আমাদের নিয়মিত শরীরচর্চায় উৎসাহ দেওয়া, স্ক্রিন দেখা কমানো এবং সুষম, পুষ্টিকর আহার জুগিয়ে প্রথম থেকেই সক্রিয় হতে হবে। ডায়বেটিস হওয়া শিশুদের অবস্থার উপর যদি কড়া নজর না রাখা হয় তাহলে তাদের চোখের সমস্যা হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে। চিন্তার কথা হল, চোখের ক্ষতি হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রায়ই আমরা খেয়াল করে উঠতে পারি না।”
ডায়বেটিস চুপিচুপি চোখের উপরেও প্রভাব ফেলে। নিয়মিত চোখ দেখানো এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা ডায়বেটিক রেটিনোপ্যাথির মত গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। সচেতনতা আর যথাসময়ে হস্তক্ষেপই এখানে আসল।
ডাঃ সাংভি আরও বললেন “নিয়মিত চোখ দেখানো প্রত্যেক শিশুর ডায়বেটিস ম্যানেজমেন্ট এবং প্রতিরোধের পরিকল্পনার অপরিহার্য অঙ্গ হওয়া উচিত। এটা তাদের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিশক্তিকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী উপায়।”

ডায়বেটিসে চোখের স্বাস্থ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডায়বেটিস কেবল রক্তে শর্করার উপর প্রভাব ফেলে না। অনেকসময় এটা নীরবে চোখের স্বাস্থ্যের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘকাল রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রেটিনার ছোট ছোট রক্তজালিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে ডায়বেটিক রেটিনোপ্যাথি হয়। যদি প্রতিরোধ না করা হয়, তাহলে কিছু সময় পরে দৃষ্টিশক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

শিশুরা সবসময় দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন না-ও বুঝতে পারে বা না-ও বলতে পারে। সেই কারণে নিয়মিত চোখ দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। গোড়ার দিকে রোগনির্ণয় হলে ডাক্তাররা দৃষ্টিশক্তি বাঁচানোর জন্য সময় মত ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং পরবর্তী জীবনে জটিলতা প্রতিরোধ করতে পারেন।

শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা
শিশুদের ডায়বেটিস ও সেই সংক্রান্ত জটিলতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালো রক্ষণ হল জীবনযাত্রায় শুরু থেকেই হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিরোধ। ডাঃ সাংভি কয়েকটা সহজ পদক্ষেপের কথা জানালেন:
রোজ অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিক কসরতে উৎসাহ দেওয়া।

স্ক্রিন টাইম দৈনিক ১-২ ঘন্টার মধ্যে সীমিত রাখা।
ফল, সবজি, হোল গ্রেন এবং লিন প্রোটিনে সমৃদ্ধ সুষম আহার দেওয়া।
বৃদ্ধি, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং দৃষ্টিশক্তির উপর নজর রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা।
এবারের শিশু দিবস এবং বিশ্ব ডায়বেটিস দিবসে বাবা-মা, প্রশিক্ষক এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রের পেশাদারদের শিশুদের ডায়বেটিস এবং চোখের স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতনতা ছড়াতে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। একজন শিশুর চোখ বাঁচানো শুরু হয় তার সামগ্রিক সুস্থতা সুরক্ষিত রাখার মধ্যে দিয়ে।

ডাঃ সাংভি জোর দিয়ে বললেন যে সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং সময় মত চক্ষু পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পারে যে শিশুরা কেবল সুস্থ শরীরে বেড়ে উঠবে না, আগামী বহুবছর পৃথিবীটাকে স্পষ্ট চোখে দেখতে পাবে।