ওয়েব ডেস্ক; ১৭ জানুয়ারি : ভারতীয় বিজ্ঞানীদের একটি দল পশ্চিমঘাটের উত্তরাংশে এক বিরল, ভূগর্ভে বসবাসকারী উভচর প্রাণীর নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছে। নতুন এই প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে Gegeneophis valmiki। এক দশকেরও বেশি সময় পরে এই বর্গের এটি প্রথম নতুন আবিষ্কার, যা তথাকথিত “লুকিয়ে থাকা উভচর প্রাণী” সম্পর্কে নতুন করে আলোকপাত করেছে।
আবিষ্কার ও নামকরণ
এই প্রজাতিটি প্রথম সংগ্রহ করা হয় ২০১৭ সালে, মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার বাল্মিকী মালভূমিতে, ভারতের প্রাণী সর্বেক্ষণ সংস্থার (ZSI) পদস্থ বিজ্ঞানী ড. কে. পি. দীনেশের নেতৃত্বে। আবিষ্কারের স্থানের কাছেই অবস্থিত ঐতিহাসিক মহর্ষি বাল্মীকী মন্দিরের নামানুসারে এই প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে Gegeneophis valmiki।
এই গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা Phyllomedusa-তে প্রকাশিত হয়েছে। এবং এটি ভারতের প্রাণী সর্বেক্ষণ সংস্থা (ZSI), সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়, বলাসাহেব দেশাই কলেজ এবং মহাদেয় গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে।
ছদ্মবেশের ওস্তাদ
সিসিলিয়ানরা অঙ্গহীন হয়- কেঁচোর মতো দেখতে উভচর প্রাণী, যারা মাটির গভীরে ও জৈব পদার্থের মধ্যে বসবাস করে। ব্যাঙের মতো তারা কোনও ডাক বা শব্দ করে না, ফলে, এদের খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুর্লভ এবং প্রায়শই ঘটনাচক্রেই হয়ে থাকে।
ড. দীনেশ বলেন, “Gegeneophis বর্গের প্রাণীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন। সাধারণভাবে এদের ‘অন্ধ সিসিলিয়ান’ বলা হয়, কারণ এদের চোখ শক্ত খোলকের নিচে লুকানো থাকে। এদের দেখতে ও চলাফেরায় এতটাই কেঁচোর মতো হয়, যে, নতুন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করতে বহু বছর ধরে বিশদ গঠনগত ও জিনগত বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।”
সংখ্যার নিরিখে জীববৈচিত্র্য
পশ্চিমঘাট বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও, সিসিলিয়ানরা এখনও অত্যন্ত বিরল ও স্বল্প পরিচিত।
সমগ্র বিশ্বে ৮,৯৮৩-টি উভচর প্রজাতির মধ্যে মাত্র ২৩১-টি সিসিলিয়ান।
ভারতে ৪৫৭-টি উভচরের মধ্যে এ পর্যন্ত ৪২-টি সিসিলিয়ান প্রজাতি নথিভুক্ত হয়েছে।
পশ্চিমঘাটে ২৬-টি স্থানীয় (এন্ডেমিক) প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ১১-টি Gegeneophis গোষ্ঠীর।
সাধারণত দক্ষিণ পশ্চিমঘাটে উভচরের বৈচিত্র্য বেশি হলেও, এই আবিষ্কার প্রমাণ করল যে, উত্তর পশ্চিমঘাটে Gegeneophis প্রজাতির ঘনত্ব রয়েছে।
পরিবেশের গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
দুর্লভ হওয়ার পাশাপাশি, সিসিলিয়ানদের পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কৃষিতে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। এরা গর্ত খোঁড়ার ফলে মাটি ঝুরঝুরে হয় ও মাটির গঠন উন্নত হয়। এরা মাটির অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
খাদ্যশৃঙ্খলে পাখি, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ীদের খাদ্য হিসাবে এদের গুরুত্ব রয়েছে।
জলজ ও স্থলজ জীবনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এই গোষ্ঠীর প্রাণীরা এক গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনধারার প্রতিনিধিত্ব করে।
ZSI–এর অধিকর্তা ড. ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায় সতর্ক করে বলেন, “বিশ্বের ৪১ শতাংশ উভচর প্রজাতি আজ বিলুপ্তির পথে। এই প্রজাতিগুলিকে নথিভুক্ত করা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নথিভুক্ত করা না হলে এদের ‘নীরব বিলুপ্তি’ ঘটবে, অথচ আমরা জানতেই পারব না যে এদের কখনো অস্তিত্ব ছিল।”
ভবিষ্যতের পথে
সংরক্ষণবিদ নির্মল ইউ. কুলকার্নি জানান, এই আবিষ্কার কেবল শুরু। বংশগত গবেষণা (ফাইলোজেনেটিক স্টাডি) ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তর পশ্চিমঘাটে আরও বহু অজানা প্রজাতি লুকিয়ে থাকতে পারে। বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পাওয়া কেবলমাত্র প্রথম ধাপ, যার মাধ্যমে এই “লুকিয়ে থাকা” উভচর প্রাণীদেরকে সংরক্ষণের মূলধারায় আনা এবং তাদের স্পর্শকাতর আবাসভূমি রক্ষা করা সম্ভবপর হবে।
