ওয়েব ডেস্ক; ৩ মার্চ :
মূল প্রাপ্তিসমূহ
২০২৫-২৬-এর এপ্রিল-জানুয়ারি সময়কালে মোট রপ্তানি ৭২০.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে (বার্ষিক ৬.১৫% বৃদ্ধি)

একই সময়ে পরিষেবা রপ্তানি ৩৫৪.১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক ১০.৫৭% বৃদ্ধি)

বৈদ্যুতিন সামগ্রী, যানবাহন, ওষুধ ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত সহায়তায় সম্প্রসারিত হচ্ছে

এক্সপোর্ট প্রমোশন মিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাণিজ্য অর্থায়ন, লজিস্টিক্স, কমপ্লায়েন্স ও বাজার সম্প্রসারণকে শক্তিশালী করছে

কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ কৌশলগত উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি প্রতিযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ করেছে

ভূমিকা

কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬ অনুযায়ী, শক্তিশালী ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, কার্যকর ঋণ প্রবাহ, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার এবং স্বস্তিদায়ক চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ভিত্তিতে ভারতের প্রবৃদ্ধি “বিশ্বের কাছে ঈর্ষণীয়”।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নীতি-অনিশ্চয়তা সূচকের ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খল গঠন এবং বহুমুখী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক আমদানি প্রতিস্থাপন নীতির পাশাপাশি রপ্তানিমুখী কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সুদৃঢ় করা হচ্ছে।

উৎপাদন ক্ষেত্রে নবজাগরণ : দেশীয় সক্ষমতা নির্মাণ

‘স্বদেশি’ ও ‘আত্মনির্ভরতা’ ভাবনার ভিত্তিতে বিভিন্ন শিল্পে লক্ষ্যভিত্তিক প্রোৎসাহন ব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ’ বা উৎপাদন সংযুক্ত উৎসাহবর্ধক-এর মতো উদ্যোগ উৎপাদন ক্ষেত্রে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন এনেছে।

বৈদ্যুতিন পন্য ক্ষেত্রে সাফল্য

ভারতের বৈদ্যুতিন পন্য উৎপাদন ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১.৯ লক্ষ কোটি টাকা থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১.৩ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে – প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি।

২০২০-২১ সাল থেকে বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উৎপাদনে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে। গত এক দশকে এই ক্ষেত্রে প্রায় ২৫ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

মোবাইল উৎপাদন ক্ষেত্রে উৎপাদন মূল্য ১৮,০০০ কোটি টাকা থেকে ৫.৪৫ লক্ষ কোটি টাকাতে উন্নীত হয়েছে – ২৮ গুণ বৃদ্ধি। বর্তমানে, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন উৎপাদক দেশ, যেখানে ৩০০-র বেশি উৎপাদন ইউনিট কার্যকর রয়েছে।

বাজেট ২০২৬-২৭-এ ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০’ চালুর ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি, ৪০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ-সহ ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিম সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

ভারত ইতোমধ্যে ছয়টি রাজ্যে ১০টি সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার মোট বিনিয়োগ প্রায় ১.৬ লক্ষ কোটি টাকা।

অটোমোবাইল শিল্পের অগ্রগতি

ভারত বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম দুই ও তিন-চাকাবিশিষ্ট যানবাহনের বাজার এবং যাত্রী ও বাণিজ্যিক যানবাহনে তৃতীয় বৃহত্তম।

আর্থিক বছর ২০২১-এর ২২,৬৫২ হাজার ইউনিট উৎপাদন থেকে আর্থিক বছর ২০২৫-এ বেড়ে ৩১,০২৮ হাজার ইউনিট হয়েছে। একই সময়ে দেশীয় বিক্রি ১৮,৬২০ হাজার ইউনিট থেকে ২৫,৬০৭ হাজার ইউনিটে উন্নীত হয়েছে।

গত এক দশকে উৎপাদনে প্রায় ৩৩% বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

‘ফার্মেসি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসাবে ভারতের অবস্থান

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ওষুধ উৎপাদক (পরিমাণের ভিত্তিতে) এবং একাদশ বৃহত্তম (মূল্যের ভিত্তিতে)। অর্থনৈতিক বছর ২০২৫-এ এই ক্ষেত্রের বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ মোট ৪.৭২ লক্ষ কোটি টাকা।

অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতা জোরদার করা হয়েছে, ফলে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাচ্ছে।

প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা

বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের অন্তত ৬৫% দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।

দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন অর্থবর্ষ ২০১৫ -এর ৪৬,৪২৯ কোটি টাকা থেকে আর্থবর্ষ ২০২৫-এ ১.৫৪ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

২০২৯ সালের মধ্যে ৩ লক্ষ কোটি টাকা প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং ৫০,০০০ কোটি টাকা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থবর্ষ ২০২৫-এ প্রতিরক্ষা রপ্তানি ২৩,৬২২ কোটি টাকাতে পৌঁছেছে, যা ২০১৪ সালের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি।

রপ্তানি স্থিতিস্থাপকতা ও বহুমুখীকরণ

এপ্রিল-জানুয়ারি ২০২৫-২৬ সময়ে মোট রপ্তানি ৭২০.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

পণ্য রপ্তানি

উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে উল্লিখিত ক্ষেত্রে-

অন্যান্য শস্য (৮৮.৪৯%)
কফি (৩৬.০৩%)
লৌহ আকরিক (৩১.৫৪%)
সামুদ্রিক পণ্য (১৩.২৯%)
প্রকৌশল পণ্য (১০.৩৭%)

বৈদ্যুতিন পন্যের রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে অর্থবর্ষ ২০২৫-এ তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে স্মার্টফোন রপ্তানি ১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পরিষেবা রপ্তানি

অর্থবর্ষ ২০২৫ এ পরিষেবা রপ্তানি ৩৮৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে (১৩.৬% বৃদ্ধি)। পরিষেবা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১৮৮.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০২৫-২৬-এর এপ্রিল-জানুয়ারি সময়কালে পরিষেবা রপ্তানি ৩৫৪.১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১০.৫৭% বৃদ্ধি)।

উপসংহার

ভারতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে আমদানি প্রতিস্থাপন ও রপ্তানি সম্প্রসারণ একসঙ্গে অগ্রসর হতে পারে। মোবাইল ফোন, ওষুধ, অটোমোবাইল বা যানবাহন ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে আত্মনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক সংযুক্তি পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।