ওয়েব ডেস্ক; ১৫ জুলাই : কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান আজ পাট ক্ষেত্রের উন্নয়নে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান। তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণ, গুণগত মানোন্নয়ন, মূল্য সংযোজন এবং কৃষকদের জন্য উন্নত বাজার–সংযোগ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

ব্যারাকপুরে আইসিএআর–সেন্ট্রাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর জুট অ্যান্ড অ্যালায়েড ফাইবার্স (ICAR-CRIJAF) আয়োজিত কৃষক সভা এবং কৃষক-বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ মতবিনিময় সভা–য় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, পাটচাষিরা যাতে লাভজনক মূল্য পান এবং বিশ্বে পাট উৎপাদন ও রপ্তানিতে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়, সেই লক্ষ্যেই কেন্দ্র সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিজ্ঞানী, কৃষক, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য, উদ্যোগপতি এবং শিল্প প্রতিনিধিদের উদ্দেশে চৌহান বলেন, পাট কেবল একটি কৃষিজ ফসল নয়, এটি ভারতের কৃষি ঐতিহ্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, “আমাদের প্রচেষ্টা, পাটচাষি এবং এই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের জীবনমান উন্নত করা। আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাব, যাতে ভারত শুধু বিশ্বের বৃহত্তম পাট উৎপাদকই না থাকে, বরং মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য রপ্তানিতেও শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।”

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, কৃষক তখনই পাট চাষ করবেন, যখন তাঁরা লাভজনক মূল্য পাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত থাকবেন। তাই উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি, পাটের গুণগত মান বৃদ্ধির ওপরও তিনি জোর দেন। তিনি বলেন, “উন্নত মানের পাটের জন্য কৃষক আরও ভালো দাম পাবেন। আমাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হল উন্নত জাত এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে উৎপাদনশীলতা বর্তমান স্তর থেকে বৃদ্ধি করে প্রায় ৩২ কুইন্টাল প্রতি হেক্টরে উন্নীত করা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে তা ৪০ থেকে ৪৫ কুইন্টাল প্রতি হেক্টরে পৌঁছে দেওয়া।”

প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে চৌহান বলেন, শ্রমের প্রয়োজন, উৎপাদন ব্যয় এবং প্রক্রিয়াকরণের সময় কমাতে যান্ত্রিকীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত কৃষিযন্ত্রগুলির প্রশংসা করে বলেন, আইসিএআর-সিআরআইজেএএফ পাট চাষ এবং তন্তু আহরণের জন্য যে যন্ত্রগুলি উদ্ভাবন করেছে, সেগুলি গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ঘটিয়ে এই যন্ত্রগুলি বাণিজ্যিকভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে পাট চাষ আরও সহজ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী হয়।”

মন্ত্রী পাট পচন (Retting) প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং পাটচাষিদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বিজ্ঞানীদের উচ্চ ফলনশীল, জলবায়ু–সহনশীল পাটের জাত এবং উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান, যাতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পায়।

বিপণন–সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গে চৌহান সংগ্রহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “কৃষক তাঁর পরিশ্রমের প্রকৃত মূল্য পাবেন। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভোক্তার দেওয়া মূল্য এবং কৃষকের প্রাপ্ত মূল্যের মধ্যে ব্যবধান যতটা সম্ভব কমে।”

সমবায়ভিত্তিক কৃষি উদ্যোগকে উৎসাহিত করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কৃষকদের আরও বেশি কৃষক উৎপাদক সংগঠন গঠনের আহ্বান জানান, যাতে উন্নত মানের উপকরণ, বিপণন, প্রক্রিয়াকরণ এবং মূল্য সংযোজনের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। তিনি পাট ক্ষেত্রে ফসল কাটার পরবর্তী পরিকাঠামো গড়ে তুলতে কৃষি পরিকাঠামো তহবিল–এর আরও কার্যকর ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

চৌহান ঘোষণা করেন, পাট ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির জন্য কৃষক, বিজ্ঞানী, শিল্প প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে একটি বিশেষ চিন্তন বৈঠকের আয়োজন করা হবে। তিনি বলেন, “সমস্ত অংশীজনকে নিয়ে আমরা একসঙ্গে বসব এবং পাট চাষ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করব।”

উন্নত মানের বীজ উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব ভারতের একটি প্রধান বীজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গকে এমন একটি বীজ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা, যেখানে উন্নত মানের পাটবীজ উৎপাদিত হবে এবং সেখান থেকেই সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।”

এর আগে আইসিএআর-সিআরআইজেএএফ–এর অধিকর্তা ড. গৌরাঙ্গ কর অতিথিদের স্বাগত জানান এবং কৃষক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও অন্যান্য অংশীজনদের জন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্নত মানের তন্তু এবং মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ‘ফাইবার টু ফরেন’ ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

আইসিএআর–এর মহানির্দেশক ড. এম. এল. জাট–ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তিনি উৎপাদন–সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে সমস্যা–নির্ভর গবেষণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণের আগে চৌহান প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও পণ্য সংগ্রহশালা, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর স্টল, কৃষিযন্ত্র প্রদর্শনী, বায়োটেকনোলজি বা জীবপ্রযুক্তে বিষয়ক গবেষণাগার এবং গবেষণা ক্ষেত্র পরিদর্শন করেন। তিনি বায়োটেকনোলজি কমপ্লেক্সের শিলান্যাস করেন এবং পাটের ইন্ধনযোগ্য বায়োমাস থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদন, বায়োচার, ব্রিকেটিং প্রযুক্তি এবং আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি পরিকাঠামো উন্নয়নে গবেষণা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সফরকালে তিনি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা সদস্য এবং কৃষকদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন এবং প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

এই কর্মসূচিতে প্রায় ২০০ জন কৃষক, মহিলা কৃষক, উদ্যোগপতি, বিজ্ঞানী, শিল্প প্রতিনিধি এবং আধিকারিকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।