ওয়েব ডেস্ক; ১৯ আগস্ট: বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনগুলিকে বাজার-উপযোগী সমাধানে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে ব্যারাকপুরের আইসিএআর-সিআইএফআরআই (ICAR-CIFRI), গত ১৭ আগস্ট তার ক্যাম্পাসে আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর ৮০তম বছর উদযাপনের অংশ হিসাবে “আইপিআর এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর” বিষয়ক একটি কর্মশালার আয়োজন করে। এই কর্মসূচিতে মেধা স্বত্ব সুরক্ষা, প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ এবং গবেষণার উদ্ভাবনগুলিকে গবেষণাগার থেকে কৃষক, উদ্যোক্তা, শিল্প ও সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সরকারি আধিকারিক, উদ্যোক্তা এবং মৎস্য ক্ষেত্রের অংশীদারদের একত্র করা হয়েছিল।
এই কর্মশালায় গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পেটেন্ট, কপিরাইট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন, ট্রেডমার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তি-হস্তান্তর প্রক্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোহনপুরের বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অশোক কুমার পাত্র। বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন আয়ুষ মন্ত্রকের অধীনস্থ কলকাতার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি-র যুগ্ম অধিকর্তা (প্রশাসন) এবং প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক (ড.) কুমারভেল ভি. এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মৎস্য দপ্তরের যুগ্ম অধিকর্তা এ. এস. আলভি।
নয়াদিল্লির অ্যাগ্রিনোভেট ইন্ডিয়া লিমিটেডের সিইও ড. প্রদীপ মালিক ভার্চুয়ালি বিশেষ অতিথি হিসাবে যোগ দেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করে ড. মালিক জোর দিয়ে বলেন যে, মেধা স্বত্ব রক্ষা করা কেবল প্রথম পদক্ষেপ; চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্যিকীকরণ এবং প্রযুক্তি-হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রযুক্তিগুলি প্রান্তিক ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা। তিনি আইসিএআর প্রযুক্তিগুলির বাণিজ্যিকীকরণ এবং ব্যাপক ব্যবহারে সহায়তা করার ক্ষেত্রে অ্যাগ্রিনোভেট ইন্ডিয়া লিমিটেডের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথি হিসাবে তাঁর ভাষণে ড. পাত্র জোর দিয়ে বলেন যে, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনগুলিকে কৃষক, উদ্যোক্তা এবং সমাজের জন্য সুফলে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইপিআর সুরক্ষা এবং দক্ষ প্রযুক্তি হস্তান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর অধিকর্তা ড. প্রদীপ দে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রযুক্তিতে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনগুলিকে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে মেধা স্বত্ব অধিকারের (আইপিআর) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, মেধা স্বত্বের কার্যকর সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিকীকরণ একটি শক্তিশালী উদ্ভাবনমূলক বাস্তুতন্ত্র তৈরি করতে, উদ্যোক্তা তৈরি করতে এবং গবেষণাগার থেকে মাঠে দেশীয় প্রযুক্তির হস্তান্তর ত্বরান্বিত করতে অপরিহার্য। ড. দে আরও বলেন, গবেষণা-শিল্প-উদ্যোক্তা যোগাযোগ জোরদার করা এবং উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে মৎস্য ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি, স্বনির্ভরতা এবং উন্নয়ন সুনিশ্চিত করে “বিকশিত ভারত @২০৪৭”-এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
আলভি বলেন, আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর এ ধরনের উদ্যোগ বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান দূর করতে, প্রযুক্তি হস্তান্তর উৎসাহিত করতে, উদ্যোক্তা তৈরিতে এবং মৎস্য ক্ষেত্রের উন্নয়নে অবদান রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উদ্ভাবন থেকে উদ্যোগে প্রযুক্তি লাইসেন্স প্রদান করা ছিল এই কর্মশালার একটি প্রধান আকর্ষণ, যা সিএসবি-সিটিআরটিআই-এর সঙ্গে যৌথভাবে আইসিএআর-সিআইএফআরআই দ্বারা প্রস্তুত করা রেশমিন গোল্ড+ মাছের খাবারের প্রযুক্তির হস্তান্তরের জন্য একটি লাইসেন্স চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এই চুক্তিটি এই যৌথ গবেষণার উদ্ভাবনটিকে বাণিজ্যিকীকরণ এবং এর ব্যবহার সম্প্রসারণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের উদাহরণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল আইসিএআর-সিআইএফআরআই এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথি (এনআইএইচ)-র মধ্যে একটি সমঝোতাপত্র (MoU) স্বাক্ষর করা। এই সমঝোতাপত্রটি পারস্পরিক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং উদ্ভাবনী অনুসন্ধানের একটি পরিকাঠামো প্রস্তুত করে, যা নতুন বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তঃবিষয়ক অংশীদারিত্বের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রদর্শন করে।
এই উপলক্ষে ‘৮০ ইয়ার্স অফ সিআইএফআরআই টেকনোলজিস’ শীর্ষক প্রকাশনাও উন্মোচিত হয়, যা ইনস্টিটিউটের আট দশকের গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং অভ্যন্তরীণ মৎস্য উন্নয়নে অবদানের যাত্রাকে তুলে ধরে। এছাড়াও আইসিএআর-সিআইএফআরআই দ্বারা প্রস্তুত ‘ওয়েটল্যান্ড হেলথ কার্ড’-ও উন্মোচন করা হয়, যা জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কর্মশালাটি আইপিআর সুরক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং আইসিএআর প্রযুক্তিগুলির বাণিজ্যিকীকরণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য একটি কৌশলগত মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। কার্যক্রমটি এই প্রয়োজনটিকে পুনর্নিশ্চিত করেছে যে, গবেষণার ফলাফল যেন গবেষণাগারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তব বিশ্বে প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক-শিল্প যোগাযোগ, উদ্যোক্তা-চালিত প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ হস্তান্তর প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
কর্মশালা, প্রযুক্তি লাইসেন্সিং চুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতাপত্র এবং ‘৮০ ইয়ার্স অব সিআইএফআরআই টেকনোলজিস’-এর উন্মোচন যৌথভাবে আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর একটি শক্তিশালী গবেষণা-থেকে-বাজারমুখী বাস্তুতন্ত্র তৈরি এবং উদ্ভাবন-ভিত্তিক, মৎস্য উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার যাত্রাকে তুলে ধরেছে।
