কলকাতা; ১৪ সেপ্টেম্বর : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈবপ্রযুক্তি দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. কল্যাণ চক্রবর্তী কলকাতার CSIR-Central Glass and Ceramic Research Institute (CSIR-CGCRI)-তে ‘Quantum and Semiconductor Technologies : Innovations for the Future (CQST-2026)’ শীর্ষক দু’দিনের জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে CSIR-CGCRI-এর অধিকর্তা অধ্যাপক বিক্রমজিৎ বসুও উপস্থিত ছিলেন। এই উপলক্ষে CSIR-CGCRI-তে ‘Emerging Quantum and Semiconductor Technologies (EQST)’ বিভাগও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই প্রযুক্তিতে গবেষণা ও উদ্ভাবন আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন উদ্যোগ।

দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন ড. চক্রবর্তী। কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণার অগ্রভাগে থাকা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করার জন্য CSIR-CGCRI-এর অধিকর্তা, বিজ্ঞানী ও কর্মীদের অভিনন্দন জানান তিনি।

ড. চক্রবর্তী বলেন, ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে গবেষণাগারে হওয়া নীরব অগ্রগতির হাত ধরে। বর্তমানে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের দ্রুত বিকাশের মধ্য দিয়ে বিশ্বও তেমনই এক পরিবর্তনের সাক্ষী।

আগের প্রযুক্তিগত যুগগুলির প্রসঙ্গ এনে তিনি বলেন, ইস্পাত ও বিদ্যুৎ যেমন শিল্পযুগকে বদলে দিয়েছিল এবং সফটওয়্যার তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পরিবর্তন এনেছিল, তেমনই আগামী কয়েক দশকে কিউবিট ও চিপের উপর দক্ষতা অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তিগুলিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই পরিবর্তনের সময় ভারত দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারে না।

CSIR-CGCRI ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ড. বিধানচন্দ্র রায়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে ড. চক্রবর্তী বলেন, উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার এই নতুন অধ্যায় CGCRI থেকেই শুরু হওয়া বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই CSIR-CGCRI এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকাঠামোর বিকাশ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। গত ৭৫ বছরে কাঁচ, সিরামিক, অপটিক্যাল ফাইবার ও ফোটোনিক্সের ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা গড়ে তুলতে CSIR-CGCRI অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, সদ্য চালু হওয়া EQST বিভাগ CGCRI-এর ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়ার কোনও পদক্ষেপ নয় বরং এটি সেই ঐতিহ্যেরই স্বাভাবিক এবং পরবর্তী ধাপ। নতুন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করার ক্ষমতাই এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। কোয়ান্টাম ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পশ্চিমবঙ্গের উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাগত সক্ষমতা রয়েছে বলেও তিনি জানান।

অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, অসম ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলির বিভিন্ন উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে নীতি গ্রহণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ভারত সরকারের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারিত্বের ফলে এই রাজ্যগুলি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গেরও এই অগ্রণী রাজ্যগুলির তালিকায় থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রাজ্যের সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এর বড় ভিত্তি।

জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহার মতো বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি। তাঁদের অগ্রণী গবেষণা আধুনিক পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর বিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে Indian Association for the Cultivation of Science, S. N. Bose National Centre for Basic Sciences, Indian Statistical Institute, IIT Kharagpur, IIEST Shibpur, NIT Durgapur এবং CSIR-CGCRI-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা বৈজ্ঞানিক প্রতিভা বা আগ্রহের অভাব নয়। কোয়ান্টাম ও সেমিকন্ডাক্টর গবেষণার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রের অভাব ছিল। এই পরিস্থিতিতে CSIR-CGCRI-তে EQST বিভাগ প্রতিষ্ঠা সেই ধরনের একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় কর্মসূচি এবং রাজ্য স্তরের বাস্তবায়নের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

পশ্চিমবঙ্গে কোয়ান্টাম ও সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে CSIR-CGCRI, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতর এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য দপ্তরগুলির সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দেন ড. চক্রবর্তী।

জাতীয় কোয়ান্টাম মিশনের থিম্যাটিক হাবগুলির সঙ্গে সদ্য প্রতিষ্ঠিত EQST বিভাগের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পক্ষেত্রকে নতুন এই ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করেন।

কোয়ান্টাম ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক গবেষণা থেকে গড়ে ওঠা স্টার্টআপ ও উদ্যোগগুলিকে উৎসাহ দেওয়ার উপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

CQST-2026-এ অংশ নেওয়া তরুণ গবেষক ও পড়ুয়াদের, বিশেষ করে সম্মেলনে পোস্টারের মাধ্যমে গবেষণা তুলে ধরা গবেষকদের উৎসাহিত করে ড. চক্রবর্তী বলেন, প্রযুক্তির এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় তাঁরা এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছেন।

তরুণ গবেষকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে, বিস্তৃতভাবে সহযোগিতা করতে এবং শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পেশা ও গবেষণাগার গড়ে তোলার দিকে, তিনি নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে তাঁরা ভারতের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।

এছাড়াও C-MET, পুণের অধিকর্তা জেনারেল ড. আর. রতীশসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

CSIR-CGCRI-তে Emerging Quantum and Semiconductor Technologies বিভাগ চালু এবং CQST-2026 জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন প্রতিষ্ঠানের গবেষণার পরিসর আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি, পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিতে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা ও নেতৃত্ব অর্জনের ভারতের লক্ষ্যে অবদান রাখার পথও এর মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হবে।

এই সম্মেলনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা এবং তরুণ বিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছেন। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বিজ্ঞান, উন্নত উপাদান, ডিভাইস এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির নতুন অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *