ওয়েব ডেস্ক; ১৪ সেপ্টেম্বর : কোটি কোটি ভারতীয় পরিবারের ক্ষেত্রে একটি গুরুতর অসুস্থতাই বছরের পর বছর ধরে সঞ্চয় করা অর্থ শেষ করে দিতে পারে। বর্তমানে ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক কোনও না কোনও স্বাস্থ্যবিমা বা ফাইন্যান্সিং স্কিম প্রকল্পের আওতায় থাকলেও অনেক পরিবার এখনও পর্যাপ্ত বিমা কভারেজের বাইরে রয়েছে এবং গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসার খরচ মেটানোর তুলনায় তাদের বিমার কভারেজ প্রায়ই কম পড়ে। কেয়ার হেলথ ইনস্যুরেন্স পরিবারগুলিকে স্বাস্থ্যবিমাকে এমন একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে দেখার পরামর্শ দিচ্ছে, যা চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার আর্থিক প্রভাব থেকে তাদের সুরক্ষিত রাখে।

অনেক ভারতীয় একবার স্বাস্থ্যবিমা কেনার পর তা খুব কমই পর্যালোচনা করেন, অথবা শুধুমাত্র নিয়োগকর্তার দেওয়া গ্রুপ পলিসির উপর নির্ভর করেন। এদিকে, অধিকাংশ মানুষের আয়ের তুলনায় চিকিৎসার খরচ অনেক দ্রুত হারে বাড়তে থাকায় বিদ্যমান পলিসির আওতাভুক্ত অর্থ দ্রুতই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়তে পারে। একসময় যে ২-৫ লক্ষ টাকার পলিসিকে যথেষ্ট বলে মনে করা হত, বর্তমানে গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই কভারেজ শেষ হয়ে যেতে পারে। বিমার কভার শেষ হয়ে গেলে পরিবারগুলি প্রায়ই সঞ্চয়ের টাকা তুলে নেয়, সম্পত্তি বিক্রি করে অথবা ঋণ নেয়। ফলে স্বাস্থ্যসংকট দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়।

এই ধরনের পরিস্থিতির প্রভাব অবশ্য শুধুমাত্র আলাদা আলাদা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চিকিৎসার জন্য নিজস্ব পকেট থেকে বিপুল অর্থ খরচ করা ভারতে আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে রয়েছে। ফলে পরিবারের আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা এবং ভারতের সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা কভারেজ-এর লক্ষ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বৃহত্তর স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সরকারি রিপোর্ট এবং জাতীয় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত মূল্যায়নগুলি সুরক্ষার এই ঘাটতির মাত্রা তুলে ধরেছে:

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস এস্টিমেটস অনুযায়ী, ভারতের মোট স্বাস্থ্য খরচের ৪৩.৪ শতাংশ এখনও ভারতীয় পরিবারগুলিকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি পরিবারগুলির উপর যে উল্লেখযোগ্য আর্থিক বোঝা চাপিয়ে চলেছে, তা স্পষ্ট হয়।
আর্থিক সুরক্ষা এখনও অপর্যাপ্ত: ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিসের হাউসহোল্ড কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার সার্ভে: হেলথ (২০২৫) অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের নিজস্ব পকেট থেকে করা খরচ এখনও সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে। এর ফলে স্পষ্ট যে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যবিমার আওতায় থাকা সবসময় পর্যাপ্ত আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।
বিমা থাকা পরিবারগুলিও প্রায়ই পর্যাপ্ত কভারেজের বাইরে থাকে। নিয়োগকর্তার দেওয়া গ্রুপ পলিসি এবং প্রাথমিক স্তরের ফ্যামিলি ফ্লোটার পলিসিগুলিতে সাধারণত ৩-৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কভার থাকে। অথচ একটি বড় ধরনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচই এর কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। লিভার প্রতিস্থাপনের খরচ ১৮-৩৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, উন্নত পর্যায়ের ক্যানসারের চিকিৎসা এবং জটিল হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার খরচও কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। তাই এখন প্রশ্নটি আর “আমার স্বাস্থ্যবিমা আছে কি?” নয়, বরং “আমার যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ আছে কি?”
ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা খরচের বিরুদ্ধে আর্থিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে কেয়ার হেলথ ইনস্যুরেন্স নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে:

১. প্রতি বছর আপনার স্বাস্থ্যবিমা পর্যালোচনা করুন: নিশ্চিত করুন, আপনার বিমার নির্ধারিত কভারেজের পরিমাণ বা সাম ইনস্যুরড আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রয়োজন, বসবাসের শহর এবং বর্তমান চিকিৎসা খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কয়েক বছর আগে যে পরিমাণ কভারেজ যথেষ্ট বলে মনে হয়েছিল, বর্তমানে তা আর আজকের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

২. আপনার পলিসি সম্পর্কে বুঝে নিন: ক্লেম করার সময় যাতে কোনও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্য আপনার পলিসিতে রুম-রেন্টের সীমা, কো-পেমেন্ট, সাব-লিমিট, বর্জনীয় বিষয় এবং অটোমেটিক রিচার্জ ও নো-ক্লেম বোনাসের মতো অতিরিক্ত সুবিধাগুলি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন।

৩. শুধুমাত্র নিয়োগকর্তার দেওয়া স্বাস্থ্যবিমার উপর নির্ভর করবেন না: গ্রুপ ইনস্যুরেন্স একটি মূল্যবান সুবিধা হলেও, সাধারণত এতে ৩-৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কভার থাকে, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মাকে এর আওতায় রাখা হয় না এবং চাকরি পরিবর্তন বা চাকরি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই কভারেজ শেষ হয়ে যায়। অল্প বয়সেই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা কিনে রাখলে নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, কম বয়সে ও সুস্থ থাকাকালীন প্রযোজ্য অপেক্ষার সময়সীমা সম্পূর্ণ করে নেওয়া যায় এবং তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামও নিশ্চিত করা যায়।

৪. সুপার টপ-আপ প্ল্যান বিবেচনা করুন: একটি বেস পলিসির সঙ্গে সুপার টপ-আপ যুক্ত করলে তুলনামূলক কম অতিরিক্ত খরচে আপনার আর্থিক সুরক্ষার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায়। এর ফলে ক্যানসার, হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসার খরচ মেটাতে সাহায্য পাওয়া যায়।

৫. বাবা-মা ও নির্ভরশীলদের জন্য কভারেজ: পরিবারের একজন সদস্যের অসুস্থতার কারণেই একটি ফ্যামিলি ফ্লোটার পলিসির সম্পূর্ণ কভারেজ শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই পরিবারের প্রবীণ সদস্য এবং নির্ভরশীলদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *