১৯৮৭ সাল থেকে ব্যাংক কর্মচারী সংগঠনের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সঞ্জয় দাস । তার এই দীর্ঘ পথ চলা তাকে এনে তুলেছে জাতীয় ক্ষেত্রে। আজ তিনি আইবকের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তার একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে ব্যাংক কর্মচারীদের আন্দোলন, জাতীয় নীতি সহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য, অজানা কথা।
দীর্ঘ সময় ধরে ‘শুভাবরি’ ব্যাংক অফিসার এবং ব্যাংক কর্মীদের আন্দোলনের সংবাদ পরিবেশন করে আসছে একনিষ্ঠভাবে। আজকের এই সাক্ষাৎকার ‘শুভাবরি’র একান্ত উদ্যোগ এবং সঞ্জয় দাস এর একান্ত সহযোগিতা।
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে আমরা একটি, দুটি বা তিনটি অংশে আপনাদের কাছে পরিবেশন করব। সংবাদ লিখন, সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্বন্ধে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত অবশ্যই আপনারা আমাদের জানাবেন।:
মুখোমুখি সঞ্জয় দাস
মুখোমুখি সঞ্জয় দাস দ্বিতীয় পর্ব
শুভাবরি: কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটি ব্যাংকের মাথার উপর বসে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগে কি অনেক সরকারি ক্ষেত্রে ভুল থাকে?
@: ভুল শুধু না পক্ষপাতদুষ্ট চিন্তা ভাবনাও থাকে।অনেক ক্ষেত্রেই সেজন্যে ঋণ গ্রহীতা চয়নেও পক্ষপাতিত্ব থাকে। তা না হলে নীরব মোদি ঋন কি করে পান!!
শুভাবরি: অত্যন্ত সুন্দর যুক্তি। কিন্তু সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের ঋণ অনাদেয়ে তাদের বিরুদ্ধে যেমন সংবাদপত্রের নাম দিয়ে নোটিফিকেশন জারি করা হয়, উচ্চশ্রেণীর ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কেন নোটিফিকেশন পত্রিকায় দেয় না? যদি এই বিষয়টা একটু খোলাখুলি বলেন।
@: ঋণখিলাপীদের নামপ্রকাশের দাবী নিয়ে গত ১০ বছর ধরে আমাদের আন্দোলন চলছে।পার্লায়ামেন্টারি কমিটি ও RBI কে অনেকবার বলা সত্ত্বেও নাম প্রকাশ করা হয়নি।
ছোট ছোট ঋণ খিলাপ হলে তাদের বাড়ি-ঘর বিক্রি করে উসুল করা হয়। কিন্তু নীরব মোদিদের ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক বিক্রির কথা বলা হয়।
শুভাবরি: আগামী দিনে এই ইস্যুতে আপনাদের কি ধরনের আন্দোলনের পরিকল্পনা রয়েছে?
@: আগামী দিনে সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন করার পরিকল্পনা আছে।
আমজনতাকেও এর সঙ্গে জোড়া হবে। সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করা মানুষদেরও সমর্থন থাকবে।
শুভাবরি: ব্যাংক পরিষেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর হওয়া সত্বেও করোনার টিকা করন, ব্যাংকের কাজের সময় কমিয়ে আনা অথবা সীমিত সংখ্যক রেল পরিষেবায় ব্যাংক কর্মচারীদের নিয়ে আসা, এমন বিভিন্ন বিষয়ে বারবার আপনাদের মুখ খুলতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে তাদের ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন?
@: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এটা আমাকেও ভাবায়। ব্যাংক পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ তখনই হয় যখন আমরা ধর্মঘটে যাই। দুদিন ব্যাংক বন্ধ থাকলে দেশ নাকি রসাতলে যাবে, কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাহ্য করা হয়।
ব্যাংক কর্মচারীদের অবদান দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কাগজে কলমে স্বীকার করলেও তাদের সুবিধা অসুবিধা দেখার বেলায় “ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা”র মতো ব্যবহার করা হয়। সে জন্যই সব কিছুর জন্য ব্যাংক কর্মচারীদের আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করতে হয়।
আমরা সব কিছুই আদায় করি কিন্তু কঠোর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। হকারদের টিকা করন এর কথা সরকারের নিজের মাথা থেকে আসলেও, আমাদের বার বার চিৎকার করে আদায় করতে হয়। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
যেদিন থেকে প্রতিযোগিতা মূলক বাজারের অর্থনীতির দিকে দেশ ঝুঁকেছে সেদিন থেকে কল্যাণকারি রাষ্ট্রের ভূমিকা থেকে সরকার সরতে চাইছে। তার ফলশ্রুতিতেই organised সেক্টর গুলোর ওপর আক্রমণ শানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।সরকার তো সরকারি ব্যাংকই চায় না। তাই সরকারি ব্যাংকের কর্মচারীদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেন টিকা করন করবে বা তাদের করোনা থেকে বাঁচার যা যা ব্যবস্থা তা নিতে উদ্যোগী হবে?
শুভাবরি: সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে স্বাধীনতার পর এই প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা কংগ্রেস এবং সিপিএম এর প্রতিনিধি শূন্য হয় পাঁচ বছর চলবে। এমন ফল কেন হয়েছে, এ সম্বন্ধে আপনার কি অভিমত?
@: গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত নির্বাচন। তার ওপর কেন্দ্রীয় সুরক্ষা বল দিয়ে করানো নির্বাচনে মানুষের রায় মাথা পেতে নিতে হবেই রাজনৈতিক দল গুলোকে। সফলতা বিফলতা যাই হোক না কেন। মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন আর বাস্তববাদী রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই এরকম ফল হয় বলে আমার মনে হয়। চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে।
শুভাবরি: পূর্ণ বহুমত নিয়ে একটি দল রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় তৃতীয়বারের জন্য আসলো। এক্ষেত্রে শ্রমিক আন্দোলন কতটা মর্যাদা পাবে এই বর্তমান সরকারের কাছে?
@: আজ পর্য্যন্ত সঠিক কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর ভরসা করে ট্রেড ইউনিয়ন করেনি। ট্রেড ইউনিয়ন তার নিজের শক্তির জোরে লড়াই করে। তাতে সরকারে কে থাকলো, না থাকলো তাতে খুব একটা কিছু যায় আসে না। আমরা এখন অনেক নেতাকেই বলতে শুনি, ‘সরকার শক্তিশালী’। ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আন্দোলন জোরদার হচ্ছে না মানে আমি কমজোর। সরকার শক্তিশালী এটা লড়াই না করার একটা অজুহাত মাত্র। আজ ট্রেড ইউনিয়ন অনেক ক্ষেত্রে স্থান দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত, অযোগ্য লোকের সমাহার। সে জন্যই ট্রেড ইউনিয়ন আজ কমজোর। সরকার শক্তিশালী, কি সরকার শ্রমিকবিরোধী, এটা পরে।
শুভাবরি: এই দীর্ঘ সময় ব্যাংক কর্মচারী আন্দোলন করতে গিয়ে আপনার দেখা সেরা তিনজন ট্রেড ইউনিয়ন জন নেতাকে এক, দুই এবং তিন নম্বর হিসেবে কিভাবে বসাবেন?
@: 1.Com.R N Godbole,
2.Com.Ranjit R Roy,
3.Com.Shanti Ranjan Sengupta.
শুভাবরি: অবসর গ্রহণের পর ভিন্ন কোন ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে আপনি যুক্ত হবেন, নাকি সম্পূর্ণ অন্য খাতে আপনার জীবন বইবে?
@: বর্তমানে অনেকেই ট্রেড ইউনিয়নকে জনকল্যাণ সংস্থা (welfare Organisation)র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে। ট্রেড ইউনিয়ন এর একটা শাখা সংগঠন হতে পারে জনকল্যাণ সংস্থা। কিন্তু প্রধান কাজ কখনোই বস্ত্র বিতরণ, কি বন্যা ত্রান বা রক্ত দান হতে পারেনা।
আজ আমরা অনেকেই এই সব কাজে বেশি মনোযোগ দেই এবং ভাবি অনেক ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করলাম। একাজ অবশ্যই দরকার কিন্তু তার জন্য শাখা সংগঠন গুলোকে জোরদার করতে হবে। নতুবা আর সেদিন বেশি দূরে নেই ব্যাংকিং পরিমণ্ডল থেকে ট্রেড ইউনিয়ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। লড়াইয়ের উদ্দেশ্য নয় ,লড়াই করা ও লড়াইয়ের মানসিকতাকে বাঁচিয়ে রাখাই ট্রেড ইউনিয়নের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য থেকে আমরা একটু সরে এসেছি।
সর্বশেষে বলি, “ট্রেড ইউনিয়ন আমার জীবনের ভালোবাসা, আমার স্বপ্ন, আমার যৌবনের উপবন , আমার বার্ধক্যের বারাণসী।”
