ডিজিটাল; প্রশান্ত ডোম: এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার দায় আমাদের সবার ই। কিন্তু কিভাবে? বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে সেটা যে আমাদের জন্য তা অস্বীকার করাও যাবে না। একদিকে বসতি তৈরীর জন্য মাইলের পর মাইল বনভূমি কেটে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে জলাভূমি বুজিয়ে দিয়ে তৈরি হচ্ছে high-rise, নগরায়ন এবং বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য শহর মধ্যস্থ বড় বড় গাছও কখনো কাটা পড়ছে। ফলে উষ্ণায়নের পাশাপাশি প্রবল ভাবে বেড়ে চলেছে পরিবেশ দূষণ। উৎসবের দিন গুলিতে এ কিউ আই অর্থাৎ এয়ার কোয়ালিটি ইন্ডেক্স রিপোর্ট এ যা ধরা পড়েছে সেটি কপালে ভাঁজ করার মত। শহর কলকাতা এর মধ্যে সবার উপরে।

মিশ্র জনসংখ্যা এবং যানবাহন সংখ্যায় বাড়তে থাকার ফলে বাতাসে কারসিনোজেন এর পরিমাণ বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, ক্যান্সার রোগের কারণ হলো এই কারসিনোজেন। এটি সৃষ্টি হয় ডিজেল চালিত গাড়ির ধোঁয়া থেকে, যা ধূমপানের সমান ক্ষতিকর বলে বলা হয়। এজন্য ফুসফুসের ক্যানসার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সাথে রয়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং লেদ ডাষ্ট। এর প্রভাবে কলকাতার প্রায় ১৮ মিলিয়ন জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপনার আমার পরবর্তী প্রজন্মও এর থেকে রেহাই পাবেনা। প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত।

২০০৬-০৭ সালে কলকাতার রাস্তায় চলতে গেলে বাতাস অত্যন্ত ভারী মনে হতো। চোখ জ্বালা করত বাইক বা সাইকেল আরোহী এবং পথচারী মানুষের। সময় বদলেছে, বদলেছে শাসক এবং শাসন প্রণালী। সিএনজি অটো কলকাতার পথে নামল। পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০১০-১১ সালের প্রথম দিকে আমরা দেখলাম পথচারী-গাড়ি চালকদের পূর্বের তুলনায় কষ্ট কম হচ্ছে। আসলে এই সময় এর আগে অটোতে পেট্রোল এর বদলে ব্যবহার করা হতো ‘কাটা তেল’। ডিজেলের সাথে অন্য কিছু সামগ্রী মিশিয়ে তৈরি একটি কমদামি বেআইনি জ্বালানি। কাটা তেলের ব্যবহার বন্ধ হতে পরিবেশ পরিবহন দপ্তর পুরনো গাড়ি চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি চাইলেও অনিচ্ছুক গাড়ি মালিকেরা এর বিরুদ্ধে আইনি পথে এগিয়েছিলেন। বিষয়টি কোর্টের বিবেচনাধীন।

শাসন ব্যবস্থাকে জনমুখী করে তুলতে দেশের সবচেয়ে উদ্যোগী এবং সফল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে সিএনজি বাস চালু করলেন, পরবর্তী সময়ে ই-বাসও চালু হলো। আমাদের প্রিয় রাজ্যকে দূষণমুক্ত করতে এবং জেলা গুলোর সাথে কলকাতার যোগাযোগ আরো দৃঢ় করতে এ পদক্ষেপ অবশ্যই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি সদর্থক দিক। কিন্তু শহর কলকাতার ভারী বাতাস আজ মুক্তি চাইছে এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে। শাসনভার হাতে নেবার পরে বিজ্ঞাপনের হোল্ডিং সরিয়ে আমাদের রোজ মুক্ত আকাশ দেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন মাননীয়া। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কলকাতা পৌরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ফুটপাত প্লাস্টিক মুক্ত করে শাস্তি দিয়েছিলেন। যদিও কলকাতার ফুটপাত আদৌ সেভাবে প্লাস্টিক মুক্ত হতে পারেনি।

জেলাগুলোর সাথে রাজধানী কলকাতার মসৃণ যোগাযোগের জন্য কাম্য। কিন্তু একই উপায়ে ইন্ডেক্স যখন বলছে বায়ুদূষণে কলকাতার দিল্লিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে, তখন কলকাতার দিকে আগে নজর দিতে হবে। অন্যথায় ক্যান্সার আক্রান্ত নবপ্রজন্মের কচি আঙুলগুলো প্রশাসনের দিকে অভিযোগের তীর নিশানা করতে শুরু করবে আগামী দিনে। আধুনিক সভ্যতায় আমরাও কিন্তু মুখ লুকানোর জায়গা পাবো না।

কলকাতা শহরের ময়দান সংলগ্ন এলাকা সামরিক বিভাগের অধীনে থাকার ফলে কাজ কাটা অথবা হাইরাইজ এখানে থাবা বসাতে পারেনি। কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলে পর্যাপ্ত কাজে লাগানোর প্রয়োজন। ঘটা করে আমরা ‘বন সপ্তাহ’ পালন করি। সেমিনার করে গাছের চারা বিতরণ করে ট্যবলো সাজিয়ে মিছিল করা দিন প্রতিদিন নিয়ম রক্ষায় পরিণত হয়েছে। চারাগাছের লাগানোকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে চলে আসছে জননেতা এবং বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই চারা গাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মারা পড়ছে অথবা চুরি হয়ে যাচ্ছে অন্তত ৪০ শতাংশ। তাহলে সবুজায়ন কিভাবে সম্ভব? ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে আমাদের দোরগোড়ায়। তবুও হেলায় নষ্ট করছি বাঁচার শেষ সুযোগ।

তাই আসুন, বাড়ির আশেপাশে, বাড়ির ছাদে ভাঙা প্লাস্টিকের বালতিতেই না হয় শুরু করা যাক গাছ লাগানো। কিছু অন্তত হোক।