শুভাবরি ওয়েব ডেস্ক, ২৯ মার্চ, কলকাতা: বাঙালির পরিচিতি ও সত্তার মূল্যায়ন এবং সেই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চিরকালীন সমস্যাগুলি নিয়ে নানা রঙের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া গেল TV9 বাংলা আয়োজিত ‘বাংলা বৈঠকে’। কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে বাঙালির কাল-আজ-কালের আলোচনা-পর্যালোচনা-কাটাছেঁড়ায় মেধা ও গ্ল্যামারের বিচ্ছুরণ হল বারবার।

সঞ্চালনায় ছিলেন TV9 বাংলার ম্যানেজিং এডিটর অমৃতাংশু ভট্টাচার্য, কনসাল্টিং এডিটর অনির্বাণ চৌধুরী, পিউ রায়, লিমা চট্টোপাধ্যায়, মঞ্জিরা দত্ত ও রুমেলা চক্রবর্তী। কথাবার্তা অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন TV9 নেটওয়ার্কের সিইও বরুণ দাস ও অমৃতাংশু ভট্টাচার্য। আগাগোড়া দোহার-এর গান যুক্তিজালের সীমা ছাপিয়ে ছড়িয়ে দিল সুরেশ রেশ।

বাঙালি কী করে আবার সামনের সারিতে উঠে আসতে পারে, সেই অন্বেষণেই TV9 বাংলায় চলছে বাঙালিয়ানা চর্চা। তার সূত্রেই এই বাংলা বৈঠকের আয়োজন। TV9 বাংলায় বাঙালিয়ানা চর্চা শুরু হয়েছিল গত ১৩ ফেব্রুয়ারি।

বাংলা বৈঠকে আলোচনার প্রথম বিষয় ছিল, বাঙালি কি শ্রমবিমুখ, ঝুঁকি নিতে ভয় পায়? সঞ্চালক অনির্বাণ চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘শৈশবে বাঙালি কুলি, টাঙাচালক, ট্যাক্সিচালক দেখিনি। দেশভাগের পর বাঁচার লড়াইয়ের কারণে এটা রইল না। তবে বাঙালি নিজেকে অন্য ভাষাভাষীদের থেকে বুদ্ধিমান ভাবে। প্রতিযোগিতায় নামতে ভয় পায়। এখন বাঙালি অবশ্য পুরনো ধুলোময়লা ঝেড়ে ফেলে লড়াই করছে। বাঙালির অস্মিতা আছে, কিন্তু সে প্রাদেশিক নয়।’

এগারোটি ভাষার ছবিতে কাজ করা বিশিষ্ট অভিনেতা আশিস বিদ্যার্থীর কথায়, ‘একটা অভিবাসী মানসিকতা প্রয়োজন। যেখানে তাড়াতাড়ি ঘুম পায় না। তখন আমরা নিজেদের নতুন নতুন পথে চালিত করতে পারি। প্রসারিত করতে পারি নিজের সীমা। ৫৬ বছরেও যখন আমি স্বপ্ন দেখি তখন কম ঘুমাই। সেই সময় পূরণ করি নিজের স্বপ্ন। মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য এই ধরনের বৈঠক বা সম্মেলন জরুরি।’ এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায় তুলে ধরলেন বাঙালির ঝুঁকির ঐতিহ্য। আলোচনায় ছিলেন তন্ময় বসু ও আমলা দেবাশিস সেন।

পরের বিষয় ছিল, বাঙালি কি এখনও অর্থকে অনর্থ মনে করে? বক্তা ছিলেন ডাঃ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরী, সত্যম রায়চৌধুরী, প্রচেত গুপ্ত, ডাঃ কুণাল সরকার। TV9 বাংলার ম্যানেজির এডিটর অমৃতাংশু ভট্টাচার্যের প্রশ্নের উত্তরে ডাঃ কুণাল সরকারের সাফ কথা, ‘আমাদের একটা হাঁটু ভেঙে দিয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসকরা। আর একটা হাঁটু ভেঙে দিয়েছে দেশভাগ। আমি অবশ্য চিরকালের আশাবাদী। আমার একদিকে সোমনাথ অন্যদিকে সত্যম বসে আছেন। কী করে বলি, বাঙালি উদ্যোপতি নয়?’

টেকনো ইন্ডিয়ার গোষ্ঠীর অন্যতম কর্নধার, উদ্যোগপতি সত্যম রায়চৌধুরী বললেন, ‘আমি নিজে লক্ষ্মী ও সরস্বতী, দুই দেবীকেই নিয়ে চলেছি। প্রাইভেট টিউশনের পুঁজি নিয়ে একটা গ্যারাজে কম্পিউটার সেন্টার খুলেছিলাম দাদার সঙ্গে। তাই বাঙালি ব্যবসা করতে জানে না, এটা স্বীকার করি না।’ অন্যদিকে ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরীর বললেন, ‘বাঙালির মধ্যে প্রচুর আম্পায়ার। প্লেয়ার হতে না চাওয়া, খেলতে নামতে না চাওয়ার মানসিকতা থেকে বেরোতে হবে। না-হলে বালি খাদানের মধ্যেই পড়ে থাকতে হবে আমাদের।’ সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্তের উত্তর ছিল, ‘পরিচালক তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, যিনি সিনেমার জন্য লগ্নি করেছেন, তাঁর কষ্টের রোজগার ফেরত না দিতে পারলে লজ্জা লাগে। বুকের মধ্যে সোনার চাকতি, বাইরে রুপোর চাকতি, বাঙালির দুটোই থাক।’

তিন নম্বর বিষয় ছিল, বাঙালি কি আপন সৃষ্টিকর্মে আত্মমগ্ন? সাহিত্যিক-সাংবাদিক শঙ্করলাল বলছিলেন, ‘আমরা আত্মবিস্মৃতও বটে। আমরা অনুকরণে ব্যস্ত। এটা মগ্নতা নয়। সাহিত্য বা শিল্পসৃষ্টি একটা ভদ্র-সভ্য অভ্যাস। মগ্নতা ছেড়ে ছড়াবার তাগিদে কাজের কাজ হবে না। আপনাকে খুঁজে বের করা হবে। আপনি নিজে শিকারী হবেন না।’

বাঙালি কি নিজের ঢাক পেটাতে পারে না? বাঙালির কি মজ্জায় মজ্জায় রাজনীতি? বাঙালিয়ানা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে এমন দুই প্রশ্নেও জমে উঠেছিল বৈঠক। অংশ নিলেন সনাতন দিন্দা, শিলাজিৎ, শুভাপ্রসন্ন, সত্রাজিৎ সেন, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, শশী পাঁজা, নির্বেদ রায়, শতরূপ ঘোষ, তথাগত রায়।
বাঙালির রাজনীতি প্রসঙ্গে আলোচনা কিছুটা তপ্ত হল স্বাভাবিক ভাবেই। বাঙালি যে অন্যদের তুলনায় রাজনৈতিক ভাবে বেশি সচেতন, সে ব্যাপারে অবশ্য একমত প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা ও সিপিএমের তরুণ মুখ শতরূপ ঘোষ। তবে তাতে লাভ না ক্ষতি, এ নিয়ে তিনজনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তথাগত রায় বলেই দিলেন, ‘রাজনৈতিক সচেতনতা আসলে বামেদের অবদান। এটাকে আদর্শের ওপরে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এমনকী এর ফলেই ভালো-মন্দের ফারাক মুছে গিয়েছে বাঙালির কাছে।’