দেবাঞ্জন দাস; শুভাবরি ওয়েবডেস্ক, ২০ ডিসেম্বর, কলকাতা:
সোমবার দুপুর গড়িয়ে বিকাল। রবীন্দ্রসদন-নন্দন চত্বর তখন জমজমাট। ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে মেতেছে চলচ্চিত্র প্রেমী কারো হাতে দামি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল,কারো পরনে বহুমূল্য পোষাকে নন্দনে পরবর্তী শো দেখার জন্য মানুষের লাইন। তার মাঝে ব্যতিক্রমী দুটি মানুষ হাতে হাত রেখে দুজনে সিনেমা দেখতে চলেছেন।

লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে সিনেমা দেখবে ওরা দুজন।
ছেলেটির হাতে একটি প্লাস্টিকের পোটলা, এবং মেয়েটির কাঁধে একটি ব্যাগ। জামাকাপড় সেভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। এগিয়ে গেলেন নন্দন প্রেক্ষাগৃহে ঢোকার জন্য। হঠাৎ করে নন্দনের গেট কিপার জানালেন, তারা রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহের টিকিট কেটেছেন, এটা নন্দন। স্বাভাবিকভাবেই তারা এইখানে প্রবেশ করতে পারবেন না।

কি করবেন কি করবেন না এই ভাবছিলেন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে। এত ক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে তারপর সিনেমা হলে না ঢোকার একটা আক্ষেপ তাদের চোখে মুখে। এবার সেই গেট কিপার জানালেন তারা যেন রবীন্দ্র রবীন্দ্র সদনের দিকে চলে যান। ছবি শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে তাই তাড়াতাড়ি না গেলে সিট পাবেন না। এই কথা শুনতেই দুজনে হাতে হাত রেখে কিছুটা জোরে হাঁটতে থাকলেন, মানুষের ভিড় পেরিয়ে এগিয়ে গেল রবীন্দ্র সদনের দিকে। রবীন্দ্র সদনে তারা ঢুকবে কি ঢুকবে না এই দোনোমোনো পরিস্থিতিতে বেশ কিছুটা সাহস করেই কিছুক্ষন পর টিকিট দেখিয়ে ঢুকলেন তারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই দুই সেলিব্রেটি কারা? কথা বলে জানা গেল বছর ৩৫ এর রাজু মিশ্র এবং তার স্ত্রী বছর ৩০ এর পিংকি মিশ্র। রবীন্দ্র সদন অঞ্চলেই রাস্তার ফুটপাতের বাসিন্দা। ২৮ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শক। প্রতিবছর এই উৎসবে পিংকি এক আধবার সিনেমা দেখতে আসলেও রাজু তার কাজের চাপে বা সংসারকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য কোনদিনই এই চলচ্চিত্র উৎসবে আসেন নি।

রাজুর বাবা কলকাতায় কাজ করতেন, তারা বিহার নিবাসী। কুড়ি বছর ধরে রাজু কলকাতাতেই । প্লাস্টিকের বোতল, কাঁচের বোতল বিভিন্ন জিনিস রাস্তা থেকে কুড়িয়ে সেগুলিকে বিক্রি করে চলে তাদের সংসার। নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে রাজু । তারপর কোন কারনে তার আর পড়াশোনা করা হয়নি। পিংকির সাথে তার সম্পর্ক জড়ায়, সেই সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। ছয় এবং আট বছরের দুটি মেয়ে আছে রাজু আর পিংকির।

চারিদিকে লোকজন চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে জাঁকজমক দেখে রাজু আর পিংকি দুজনেরই চোখে আলোর ঝলকানি। তারা রবীন্দ্র সদনের টিকিট হাতে করে নিয়ে কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিল সে কথা নিয়ে প্রশ্ন করতেই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে তারা। বলেন, আমরা যে ধরনের পোশাক পরি আর এইখানে যেভাবে সমস্ত মানুষ পোশাক পড়ে আসছেন তাতে আমরা কি আদৌ মানানসই! তাদের জীবন প্রসঙ্গে আরও প্রশ্ন করতেই কিছুটা লজ্জা পেয়ে পিংকি আর রাজু রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে পড়ল।

চলচ্চিত্র উৎসব তো সত্যিই এক মিলন উৎসব। উঁচু-নিচু ,ধনী, গরিব সবকিছু বিভেদ ভেঙে যায় এখানে। সবকিছুর মধ্যে যে পাঁচিল সেই পাঁচিল ভেঙে পড়ে এই চলচ্চিত্র উৎসবে। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই চলচ্চিত্র উৎসব তাই এক নিদর্শন বিশ্বের কাছে। রাজু ও পিংকি যে ছবি দেখতে ঢুকলো তার বিষয়বস্তু , তার ভাবনা কিংবা তার ভাষা তারা কতটা বুঝবে সেটা জানিনা। কিন্তু এইটুকু জানি যে চলচ্চিত্র উৎসবকে ওরাও নিজের অন্তর থেকে ভালোবেসেছে। যে চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য মানুষ সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকে আর “বিশ্ব মেলে ছবির মেলায়”।