কলকাতা ; ৩ অক্টোবর : ভারতে ব্যাঘ্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে, পশ্চিমবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্রে একটি বাঘিনীকে ছাড়া হল। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে এই কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই অঞ্চলে বাঘের একটি কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সংখ্যা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘ব্যাঘ্র পুনর্বাসন কর্মসূচি’-র পর্যায়ক্রমিক সূচনা ভারতের ‘বন্যপ্রাণী সপ্তাহ ২০২৬’-এর এক যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।

বাঘিনীটিকে ছাড়ার পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ভূপেন্দ্র যাদব জানান যে, প্রাকৃতিক ভূখণ্ড ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিশেষ উদ্যোগ ও অনুপ্রেরণায় বক্সায় বাঘ ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিটি আজ বাস্তবায়িত হলো। এই সফল পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য তিনি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান।

ঐতিহাসিকভাবেই বক্সা উত্তরবঙ্গের বাঘের আবাসস্থল হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৩ সালে এটিকে ‘ব্যাঘ্র সংরক্ষণ এলাকা’ বা ‘টাইগার রিজার্ভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি ভুটান ও আসামের বনাঞ্চল এবং সংরক্ষিত এলাকার সাথে সংযুক্ত একটি বৃহত্তর বাস্তুতান্ত্রিক অঞ্চলের অংশ। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আবাসস্থলের অবক্ষয় ও খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়া, ভূমির ব্যবহারের পরিবর্তন এবং শিকারযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে এখানে বাঘের স্থায়ী বসতি বজায় রাখার মতো অনুকূল পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে এই সংরক্ষিত এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে বাঘের কোনো স্থিতিশীল বসতি দেখা যায়নি।

বক্সার এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটি ছিল একটি ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে এবং ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি’ (এনটিসিএ) ও ‘ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া’ (ডব্লিউআইআইI)-এর সহায়তায় ২০১৮ সাল থেকে যৌথভাবে ‘টাইগার অগমেন্টেশন অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট’ (বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প) বাস্তবায়িত হয়ে আসছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল আবাসস্থলের উন্নয়ন, শিকারযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি, সুরক্ষা ও নজরদারি জোরদার করা, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তি পুনরায় গড়ে তোলা। শিকারযোগ্য প্রাণীর জোগান বাড়াতে ৮০০-এরও বেশি চিতল হরিণ ছাড়া হয়েছে এবং গত আট বছরে প্রায় ৩৮০ হেক্টর তৃণভূমি পুনরুদ্ধার বা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে শিকারযোগ্য প্রাণীর সংখ্যায় ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই এলাকায় বাঘের বিচরণ সংক্রান্ত আশাব্যঞ্জক তথ্যও পাওয়া গেছে। ক্যামেরা ট্র্যাপে ২০২১, ২০২৩ এবং ২০২৬ সালে বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২৩ সালে ক্যামেরায় ধরা পড়া একটি বাঘের সাথে আসামের মানস টাইগার রিজার্ভের একটি বাঘের মিল পাওয়া গেছে, যা সংলগ্ন বাঘ-বিচরণক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এদের স্বাভাবিক চলাচলের প্রমাণ দেয়।

আজ বাঘিনীটিকে ছাড়ার মধ্য দিয়ে একটি পরিকল্পিত, পর্যায়ক্রমিক ও অভিযোজন-ভিত্তিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রথম ধাপ শুরু হলো। বিহারের বাল্মিকী টাইগার রিজার্ভ থেকে বাঘিনীটিকে এখানে স্থানান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত, প্রাণী-চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত নিয়মাবলী বা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয়েছে। অবমুক্ত করার পর টেলিমেট্রি, ক্যামেরা ট্র্যাপিং এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে প্রাণীটির ওপর নিবিড় নজরদারি চালানো হবে, যাতে তার চলাফেরা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, স্বাস্থ্য ও আচরণ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া ও মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।

এই কর্মসূচিটি কেবল বক্সা এলাকায় বাঘ ফিরিয়ে আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিবেশ ও পরিস্থিতি গড়ে তোলা যেখানে বাঘের একটি জনগোষ্ঠী স্থায়ীভাবে বসবাস ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। আবাসস্থল ও শিকারের প্রাপ্যতা, সুরক্ষার প্রস্তুতি, বাঘের সংখ্যার স্থায়িত্ব, পর্যবেক্ষণের ফলাফল এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে যৌক্তিক মনে হবে, সেখানে পর্যায়ক্রমে বাঘের সংখ্যা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কর্মসূচিটির আওতায় ৬৪টি ‘ইকো-ডেভেলপমেন্ট কমিটি’ বা ‘যৌথ বন ব্যবস্থাপনা কমিটিকে’ যুক্ত করা হয়েছ। যেখানে স্থানীয়দের সাথে আলোচনা, জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত হ্রাস এবং সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বক্সায় বাঘের সংখ্যা পুনরুদ্ধার সামগ্রিক ল্যান্ডস্কেপের নিরিখেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তরবঙ্গ, আসাম ও ভুটানের সঙ্গে এর বাস্তুতান্ত্রিক সংযোগ বন্যপ্রাণীদের একটি বিস্তৃত ও সংযুক্ত ভূখণ্ড জুড়ে বিচরণ ও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়।

এই মুক্তকরণ প্রক্রিয়াটি বক্সার সংরক্ষণ যাত্রায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। সাফল্যের মাপকাঠি কেবল মুক্ত করা বাঘের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত শিকার, কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা, বাস্তুতান্ত্রিক সংযোগ, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সময়ের সাথে সাথে একটি সুস্থ, অবাধ বিচরণশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাঘের জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই হবে এর প্রকৃত সাফল্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *