ওয়েব ডেস্ক; ১৭ ফেব্রুয়ারি:
মূল বক্তব্য

সংস্কৃতি মন্ত্রক দিল্লিতে ওল চিকি লিপির শতবর্ষ উদ্‌যাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।

কেন্দ্রীয় সরকার ওল চিকি লিপির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১০০ টাকার স্মারক মুদ্রা ও স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করছে।

পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু ১৯২৫ সালে সাঁওতালি ভাষার জন্য ওল চিকি লিপি প্রণয়ন করেন। ২০০৩ সালে সাঁওতালি ভাষা ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়।

লিপিটিতে ৩০টি অক্ষর রয়েছে। প্রতিটি অক্ষর সাঁওতালি উচ্চারণের নির্দিষ্ট ধ্বনি প্রকাশ করে।

ভূমিকা

শতাব্দীর পর শতাব্দী জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি মৌখিক ধারায় সংরক্ষিত হয়েছে। লোককথা, গান, আচার এবং কাহিনিচর্চার মধ্য দিয়ে সাঁওতালি ভাষা প্রজন্মান্তরে নিজস্ব পরিচয় অটুট রেখেছে।

ওল চিকি সাঁওতালি ভাষার স্বীকৃত লিপি। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও বিহারে এই ভাষা প্রচলিত। অস্ট্রোএশীয় ভাষাপরিবারভুক্ত সাঁওতালি দীর্ঘকাল মৌখিক ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করেছে। মানসম্মত লিপির অভাবে নথিবদ্ধকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সাহিত্য বিকাশে বাধা তৈরি হয়েছিল।

ওল চিকি লিপির শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সূচনালগ্নে আয়োজিত অনুষ্ঠান লিপিটির ঐতিহ্যকে সম্মান জানায়।

ওল চিকি লিপির শতবর্ষ উদ্‌যাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং সাঁওতালি মাসিক পত্রিকা ‘ফাগুন’-এর যৌথ উদ্যোগে আজ, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নয়া দিল্লির ড. আম্বেদকর আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল।

ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন। কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রী জুয়াল ওরাঁও এবং সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

অনুষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশ

ওল চিকি লিপি বিষয়ক বিশেষ প্রদর্শনী

স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শন

স্মারক মুদ্রা প্রকাশ

১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বিশ শতকের পূর্বে সাঁওতালি ভাষা রোমান, বাংলা, ওড়িয়া ও দেবনাগরী লিপিতে লেখা হত। এই লিপিগুলি সাঁওতালির স্বতন্ত্র ধ্বনি যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারত না। গ্লটাল স্টপ ও বিশেষ স্বরধ্বনি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হত না। ফলে, উচ্চারণ ও অর্থ বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হত। শিক্ষা ও ভাষাগত সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিত।

এই প্রেক্ষাপটে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু সাঁওতালি ভাষাকে নিজস্ব লিখিত পরিচয় দেওয়ার লক্ষ্যে ওল চিকি লিপি প্রণয়ন করেন।

পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু: ওল চিকির প্রণেতা

১৯০৫ সালে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ডান্ডবোস গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই সাঁওতালি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাষার নিজস্ব লিখিত রূপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

১৯২৫ সালে তিনি ওল চিকি লিপি প্রণয়ন করেন। ১৯৩৬ সালে ‘হাই সেরেনা’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘বিডু-চন্দন’-সহ একাধিক রচনায় সাঁওতালি সংস্কৃতি ও আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। ওড়িশা সাহিত্য আকাদেমিও সম্মান জানায়।

ওল চিকি লিপির বৈশিষ্ট্য

সাঁওতালি ভাষার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত

মোট ৩০টি অক্ষর

প্রতিটি চিহ্ন একটি নির্দিষ্ট ধ্বনির প্রতীক

গ্লটাল স্টপ-সহ স্বতন্ত্র ধ্বনি যথাযথভাবে প্রকাশ

লিপিটির প্রবর্তন সাঁওতালি ভাষাকে মৌখিক মাধ্যম থেকে সুসংগঠিত লিখিত রূপে রূপান্তরিত করেছে। শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ ও উচ্চারণ নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে। শিক্ষা, অনুবাদ ও প্রকাশনার ক্ষেত্র সুদৃঢ় হয়েছে।

সাংবিধানিক স্বীকৃতি

২০০৩ সালে সংবিধানের ৯২-তম সংশোধনের মাধ্যমে সাঁওতালি ভাষা অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সিদ্ধান্ত ভাষাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। শিক্ষা, প্রশাসন ও জনসংযোগে ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। বিদ্যালয় পাঠক্রম ও রাজ্যস্তরের প্রকাশনায় ওল চিকি লিপির প্রয়োগ জোরদার হয়।

সাঁওতালি ভাষায় সংবিধান

২০২৫-এর ডিসেম্বরে ভারতের সংবিধান ওল চিকি লিপিতে সাঁওতালি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। আইন ও সাংবিধানিক অধিকার সাঁওতালি ভাষাভাষী নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য হয়েছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিলসহ জনজাতি সুরক্ষা সম্পর্কিত বিধানগুলি ভাষাগতভাবে বোধগম্য হয়েছে।

স্মারক মুদ্রা ও ডাকটিকিট

ওল চিকি লিপির শতবর্ষ উপলক্ষে ১০০ টাকার স্মারক মুদ্রা প্রকাশ করা হয়েছে। মুদ্রার একপিঠে অশোকস্তম্ভের সিংহমূর্তি ও মূল্যমান রয়েছে। অপর পিঠে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মুর প্রতিকৃতি এবং ওল চিকি অক্ষর অঙ্কিত হয়েছে। স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতিতে এটি জাতীয় মর্যাদার প্রতীক।

উপসংহার

ওল চিকি আজ কেবল একটি লিপি নয়। এটি ভাষাগত মর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এক শতাব্দীতে লিপিটি সাঁওতালি ভাষাকে শিক্ষার, সাহিত্যের এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির পথে এগিয়ে দিয়েছে।

১৯২৫ সালে পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু- সৃষ্ট এই লিপি আগামী প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন হয়ে থাকবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সমষ্টিগত স্মৃতি ও পরিচয়ের জীবন্ত প্রকাশ।