ওয়েব ডেস্ক; সৌম্যদীপ বেরা : রঘুরাজপুর। নামটা শুনেছেন কখনো? না, এখানে খুব বেশী লোকজন আসেন না। তাই নামটা চেনা নয় অনেকের কাছে। অথচ পুরী থেকে মাত্র চোদ্দ কিলোমিটার দূরে এই ছোট্ট গ্রাম এখনো অনেকটাই অজানা, অচেনা।

আমারও বিশেষ কিছু জানা ছিল না। শুধু শুনেছিলাম ওখানে হস্তশিল্পের নানা রকম জিনিস তৈরী হয়। কিন্তু আমার কৌতহল ছিলো বরাবরই । তাই একটু ইন্টারনেট এ বিচরণ করতে শুরু করলাম। অনেক খোজা খুঁজির পর যা জানলাম, তাকে এক কথায় শিল্পপ্রেমীদের স্বর্গ বলা যায়।

রঘুরাজপুর এমনই এক গ্রাম যেখানে প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া জায়গাটি বিখ্যাত ওডিসি প্রচারক এবং গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মভূমি। গ্রামটি Tussar paintings, পাম পাতায় কারুকার্য, কাঠে খোঁদাই, কাঠ গোবর এবং কাগজ মণ্ড দিয়ে তৈরি পুতুল এবং মুখোশের জন্য বিখ্যাত।

নারিকেল, পাম, আম এবং কাঁঠালের বনে ঘেরা গ্রামটিতে ১২০ টির মত ঘর । ঘরগুলোর দেয়াল দেয়ালচিত্র দিয়ে সাজানো। এখানে পটচিত্র শিল্পীরা পটচিত্র তৈরির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মুখোশ, পাথরের দেব-দেবী, কাগজের মণ্ড, ভাস্কর্য, কাঠের পুতুলও তৈরি করে । রাস্তার দুধারে প্রতিটা বাড়ির বাইরের দেওয়ালে অসাধারণ সব ছবি আঁকা। কোথাও শ্রীকৃষ্ণের জীবন কাহিনির নানান দৃশ্য, কোথাও হনুমান, কোথাও গণেশ, কোথাওবা সুন্দর সুন্দর নকশা। একটা ছোট গ্রামে একটি অতি সাধারণ বাড়ির ভেতর যে অসাধারণ চিত্র রয়েছে তা কল্পনার অতীত। শিল্পী মহলের কাছে পটের কথা আসলে রঘুরাজপুরের কথা আসবেই। পটচিত্র কাপড়ের ওপর আঁকা ছবির উৎপত্তি সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীতে।

পুরীতে জগন্নাথদেবের প্রধাণ দুটি উৎসব হল স্নানযাত্রা এবং রথযাত্রা। স্নানযাত্রার সময় জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে একশো আট ঘড়ার জলে স্নান করানো হয়। এর ফলে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তখন তাঁদের দর্শন পাওয়া যায় না। আবার রথযাত্রার সময় তাঁরা মাসির বাড়ি যান, তখনো মন্দিরে তাঁরা থাকেন না। এই সময় সর্বসাধারণের দর্শনের জন্যে জগন্নাথদেবের পরিধেয় বস্ত্রের ওপর তাঁদের তিন ভাই বোনের ছবি আঁকার প্রচলন হয়, কালক্রমে যা পটচিত্র নামে বিখ্যাত হয়। এটাই রঘুরাজপুর আর পট আর ইতিহাস।

রঘুরাজপুরের শিল্পীরা বংশানুক্রমে এই কাজ করে আসছেন। এক শিল্পীর স্টুডিয়োতে আশি বছরেরও পুরোনো এক পট যা এখনো অক্ষত। পটচিত্রের আকার বিভিন্ন রকমের হয়। কখনো বড়ো, কখনো ছোটো, কখনো বা সরু লম্বা এক ফালি কাপড়। কিন্তু সবক্ষেত্রেই যা চোখ টানে তা হল এর সূক্ষাতিসূক্ষ কাজ এবং উজ্জ্বল রঙ। রামায়ণ, মহাভারতের নানান ঘটনা যেন এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায়। কাপড় ছাড়াও শুকনো তালপাতার ওপর আঁকা হয়। তালপাতার ওপর প্রধানতঃ কালো কালি দিয়েই আঁকা হয়। এর জন্যে ব্যবহৃত হয় লোহার পেন। শুকনো তালপাতার সরু সরু ফালি সুতো দিয়ে জুড়ে তার ওপর আঁকা হয়, আবার তা ভাঁজে ভাঁজে মুড়েও ফেলা যায়। ছোট্ট ছোট্ট তালপাতার ওপর কী নিখুঁত আঁকা তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

ল্যাম্পের ওপর টিনের প্লেট রেখে তাতে পড়া কালি থেকে কালো রঙ, তাছাড়া আরো নানা রকম পাথরের গুঁড়ো থেকে অন্যান্য রঙ। শাকসবজি থেকে তৈরী রঙও এঁরা ব্যবহার করেন। আগেকার দিনে শিল্পীরা স্কেল, কম্পাস এসব কিছুই ব্যবহার করতেন না, তবে এখন এসব ব্যবহারের চল হয়েছে। পটচিত্রে আঁকার বিষয়বস্তু জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ছাড়াও বিষ্ণুর দশাবতার, রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণের নানান ঘটনা।

এখানেই শেষ নয়। রঘুরাজপুরের হস্তশিল্পের আরো সুন্দর সুন্দর নমুনা আছে। যেমন নারকোল ছোবড়া দিয়ে নানা রকম জিনিস তৈরী করা। ঘোড়া, হরিণ, নারকোল গাছ, বাবুই পাখির বাসা – কিছুই বাদ নেই। সুপুরির ওপর রঙ করে সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা, তারপর সুপুরির মাথার ওপর একটা ছোটো আংটা জুড়ে তাতে সুতো লাগিয়ে ঝোলানোর ব্যবস্থা। ব্যবহৃত নারকোলের ফেলে দেওয়া মালাকে আবার জোড়া হয়। তার ওপর কাদার প্রলেপ লাগিয়ে সাদা রঙ করা হয়। তারপর তাতেও সুন্দর সুন্দর ছবি, নকশা ইত্যাদি এঁকে ঝোলানো হয়।
তবে, আপসোস হল এতো শিল্প চৰ্চার পরেও তেমন ভাবে প্রচার পাচ্ছে না

লেখার বাস্তবিকতা একবার নিজেরাই চাক্ষুষ করে আসুন না হয়।।