ওয়েব ডেস্ক; ১৯ জুন : আগামী ২১ জুন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস (IDY)-এর জাতীয় উদযাপন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীর সঙ্গে কমন যোগ প্রোটোকলে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেবেন। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপনের আগে নবান্ন সভাঘরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং আয়ুষ মন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী প্রতাপরাও জাধব এই বছরের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের গুরুত্ব, আয়োজনের ব্যাপকতা এবং প্রস্তুতি তুলে ধরেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে প্রকাশিত ডাকবিভাগের ১২টি বিশেষ ফিলাটেলিক কভার প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপরাও জাধব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সার্কেলের চিফ পোস্টমাস্টার জেনারেল অশোক কুমার।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬-এর জাতীয় উদযাপনের আয়োজক হিসেবে কলকাতার স্বীকৃতি পশ্চিমবঙ্গের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তিনি বলেন, কলকাতা তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত এবং এই শহর সুস্থতা ও সামগ্রিক কল্যাণের মূল্যবোধকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

সভ্যতার ক্ষেত্রে যোগকে ভারতের অন্যতম মূল্যবান অবদান হিসেবে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই প্রাচীন অভ্যাস সমস্ত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও অন্তরের শান্তির সন্ধানে একত্রিত করে। এবারের যোগ দিবসের মূল ভাবনা “সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ” (Yoga for Healthy Ageing), এর উল্লেখ করে শ্রী অধিকারী বলেন, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং আবেগের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যোগ গুরুত্বপূর্ণ। যোগ মানুষকে সুস্থতর ও পরিপূর্ণতর জীবনযাপনে সহায়তা করে।

মুখ্যমন্ত্রী আয়ুষ মন্ত্রকের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে যোগকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং সারা বছরব্যাপী জনআন্দোলনে পরিণত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘যোগ ৩৬৫’, ‘সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ’, ‘অসংক্রামক রোগের জন্য যোগ’, ‘যোগ পার্ক উদ্যোগ’ এবং ‘১০০ দিনের বিনামূল্যে অনলাইন যোগ’ কর্মসূচি। এর ফলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়েছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপরাও জাধব বলেন, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬ শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি ভারতের চিরন্তন জ্ঞানের জাতীয় উদযাপন। বর্তমানে এটি স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও সামগ্রিক কল্যাণের এক বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে যোগ দিবসের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, আইসিসিআর এবং বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসগুলির যৌথ প্রচেষ্টায় এ বছর বিশ্বের প্রায় ২,৫০০টি স্থানে যোগ দিবস পালিত হচ্ছে। ২১০টিরও বেশি ভারতীয় মিশনের অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে যোগের গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন।

জাধব আয়ুষ মন্ত্রকের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘যোগ ৩৬৫’-এর সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, এর লক্ষ্য হল যোগকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা। তিনি আরও জানান, ১০০ দিনের বিনামূল্যের অনলাইন যোগ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ১৪ জুন আয়োজিত দেশব্যাপী সরাসরি যোগ সেশনে একসঙ্গে চার লক্ষেরও বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন, যা নতুন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তৈরি করেছে।

তিনি আরও জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রক দেশের ১০০টি ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ যোগ উদযাপনের আয়োজন করছে। এর মাধ্যমে যোগকে ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পর্যটন এবং সভ্যতাগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, কলকাতা ও গোটা বাংলার মানুষের উৎসাহ যোগের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগের প্রমাণ।

সাংবাদিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬-এর আগে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নয়াদিল্লিতে ১০০ দিনের কর্মসূচি, মহারাষ্ট্রের লোনারে ৭৫ দিনের অনুষ্ঠান, হায়দরাবাদের কানহা শান্তি বনে ৫০ দিনের উদযাপন এবং খাজুরাহোতে ২৫ দিনের কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হল “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর – গঙ্গা তীর যোগ যাত্রা”, যা গঙ্গোত্রী, ঋষিকেশ, হরিদ্বার, প্রয়াগরাজ, বারাণসী, পাটনা, হুগলি এবং গঙ্গাসাগরকে সংযুক্ত করছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে যোগ, পরিবেশ সচেতনতা, নদী, সংস্কৃতি এবং জনগনের অংশগ্রহণকে একসূত্রে যুক্ত করা হচ্ছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য মন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যসচিব ড. মনোজ কুমার আগরওয়াল এবং আয়ুষ মন্ত্রকের সচিব বৈদ্য রাজেশ কোটেচা।

২১ জুনের আগে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে একাধিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সাইক্লিং ফর ওয়েলনেস’, স্কুল ও সরকারি দফতরে যোগ, মানসিক সুস্থতার জন্য যোগ, মহিলাদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যোগ, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য যোগ, কর্পোরেট যোগ এবং পুলিশ, দমকল পরিষেবা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য যোগ কর্মসূচি। ‘দৌড় সে ধ্যান’ নামে একটি বিশেষ উদ্যোগ ১৯ জুন কলকাতার ১১টি স্থানে আয়োজন করা হবে। ২০ জুন হুগলি নদীর তীরবর্তী এলাকায় ‘বন্দে যোগম’ এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করা হবে। এই অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, শিল্প প্রতিযোগিতা, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা এবং আরো নানা কর্মসূচি থাকবে।

উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ হবে হুগলি নদীর উপর ৫০০টি নৌকায় একযোগে যোগ প্রদর্শন, যা যোগ এবং বাংলার সমৃদ্ধ নদী ঐতিহ্যকে তুলে ধরবে। কলকাতা জুড়ে থাকবে যোগ সম্পর্কিত আলোকসজ্জা, বিশেষ সেতু আলোকসজ্জা এবং প্রায় ৩,০০০ ড্রোনের মাধ্যমে এক বিশাল ড্রোন শো, যেখানে ভারতের যোগযাত্রা প্রদর্শিত হবে এবং মহান যোগগুরুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।

মুখ্যমন্ত্রী এবং আয়ুষ মন্ত্রী নাগরিকদের, বিশেষ করে যুবসমাজ ও প্রবীণদের, যোগকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নেওয়ার এবং শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শান্তি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য একে আজীবন অনুশীলন হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নাগরিকদের এই উদযাপনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে এবং ‘যোগ সঙ্গম’ পোর্টালে নিজেদের যোগ কর্মসূচি নিবন্ধন করতেও উৎসাহিত করা হয়েছে।

২১ জুন ভোর ৫টায় রেড রোডে জাতীয় উদযাপন শুরু হবে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ সরাসরি অংশ নেবেন এবং ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলন হিসেবে যোগের ভূমিকা আরও একবার প্রতিষ্ঠিত হবে।