জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা জেডএসআই-এর অধিকর্তা ডঃ ধৃতি ব্যানার্জী মনে করেন, মেঘালয়ার জীবিত শিকড় সেতুগুলির ইউনেস্কো স্বীকৃতি লাভের শর্ত পূরণের প্রয়োজনে সেগুলির যথাযথ স্বাস্থ্য সমীক্ষা এবং সেগুলিতে যথেষ্টসংখ্যক প্রাণী বৈচিত্র্য থাকার প্রয়োজন। মেঘালয়ার এহেন শিকড় সেতুগুলি মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র বজায় রাখার এক বিরল নজির। সম্প্রতি মেঘালয়া সরকার জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি বিশিষ্ট স্থান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করে।
মেঘালয়ার জীবিত শিকড় সেতুর (জিঙ্ককিয়েন জ্রি) নৈসর্গিক বৈশিষ্ট্য আপামর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রাকৃতিক বিস্ময় তো বটেই, বর্তমানে এই বিচিত্র সেতুগুলির বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, গবেষণা, উন্নয়ন ও জন-সমীক্ষার প্রয়োজন-ও অনুভূত হয়েছে।

শিলং-এ রাজ্য কনভেনশন সেন্টারে একটি জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয় সম্প্রতি।সেই সম্মেলনে মেঘালয়ার মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমা এই শিকড় সেতুগুলির ইউনেস্কো মনোনয়নের দাবি করেন। এই সেতুগুলি প্রচুর পাখি, প্রাণী, ছত্রাক, কীটপতঙ্গ, ফুল ও গাছের আশ্রয়স্থল। এর পাশাপাশি, মানুষ জীবিকার খোঁজে এগুলি ব্যবহার করে পারাপারের জন্য।

অনুষ্ঠানে ভাষণকালে কেন্দ্রের মুখ্য বিজ্ঞান উপদেষ্টা অধ্যাপক কে বিজয় রাঘবন বলেন, মেঘালয়ার এই শিকড় সেতুগুলি মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং বৃক্ষ বিষয়ক সংযোগ তুলে ধরেছে। এই বিরল সেতুগুলির ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া প্রয়োজন। সেই কারণেই এটির সংরক্ষণ-ও প্রয়োজন।

জেডএসআই-এর অধিকর্তা ডঃ ধৃতি ব্যানার্জী ইউনেস্কোর ৯ এবং ১০ নম্বর শর্তদুটির পূরণে প্রাণী বৈচিত্র্য এবং শিকড় সেতুগুলির স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

প্রসঙ্গত, জেডএসআই-এর দল ২০২১-এর ১৪ থেকে ২০ ডিসেম্বর মেঘালয়ার পূর্ব খাসি পাহাড়ে যান শিকড় সেতুগুলির প্রার্ণী বৈচিত্র্যের সমীক্ষা করতে। দলের নেতা জেডএসআই-এর অধিকর্তা ডঃ ধৃতি ব্যানার্জী ঐ জীবিত শিকড় সেতুগুলির সমীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করেন। জেডএসআই-এর উত্তরপূর্ব আঞ্চলিক কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ডঃ বিক্রমজিৎ সিনহা সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন। দলে ছিলেন ডেজার্ট রিজিওনাল সেন্টারের বিজ্ঞানী ডঃ রিফাত রায়না, পোর্ট ব্লেয়ারের আন্দামান ও নিকোবর আঞ্চলিক কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ডঃ অনিল কুমার দুবে, কলকাতার সদর দপ্তরের বিজ্ঞানী ডঃ দেবী শঙ্কর সুমন, কলকাতার সদর দপ্তরের বিজ্ঞানী ডঃ মনপ্রীত সিং পান্ধার, সোলানের হাই অল্টিচুড রিজিওনাল সেন্টারের ডঃ টি কুবেন্দ্রন, পাটনার গ্যাঞ্জেটিক প্লেন রিজিওনাল সেন্টারের বিজ্ঞানী ডঃ রাহুল যোশী এবং শিলং-এর নর্থ ইস্টার্ন রিজিওনাল সেন্টারের ডঃ উত্তম সাইকিয়া ও ডঃ ধিমাস।

দলটি ১১টি জীবিত শিকড় সেতু (ওয়া সোহোত, উমলিংগো, কুৎসিয়েজ, ল্যাপপাকা, টিরপা মওলো, জ্রি লিনটাংগ, মওসিয়াং অইরডি, ওয়া মিনরিয়েং রিট, ওয়া সালাং, ওয়া রিথাং, নোহওয়েট) থেকে ৮৩টি প্রাণীর (ছটি স্তন্যপায়ী, পাঁচটি জলচর এবং ৭২টি নভোচর) সন্ধান পান। দুটি সেতু থেকে এই প্রথম ছটি স্তন্যপায়ী প্রজাতির জীবের সন্ধান পাওয়া যায়। ম্যাক্রোগ্লসার্স সবরিনাস কে অ্যান্ডারসন নামে একটি ফ্রুট ব্যাট পাওয়া যায় যার থুতুতে পাওয়া গিয়েছে বীজ। মনে করা হচ্ছে বীজ ছড়ানোয় এটি অত্যন্ত কার্যকর। এরজন্য অবশ্য আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন। কীটপতঙ্গের বৈচিত্র্যের মধ্যে রয়েছে আটটি ক্রম (দুটি জলচর, ছটি নভোচর)। এগুলি শিকড় সেতুর ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। ভাইরাস-জনিত রোগের বাহক এডিস অ্যালবোপিকটাস-ও চিহ্নিত করা গিয়েছে। শিকড় সেতুর মধ্যে একটি পাথরের গর্তে মশার শুককীট পাওয়া গেছে। ফাইকাস গাছকে ঘিরে পাওয়া যায় বাম্বল মৌমাছি (বম্বাস হেমোরোয়ডালিস স্মিথ) এবং পাঁচটি অ্যাফিস মৌমাছি যারা পরাগ ছড়াতে সাহায্য করে। শিকড় সেতু এবং একটি এছাড়াও আর-ও কিছু কীট-পতঙ্গ পাওয়া গিয়েছে ঐ জীবিত সেতুগুলির আনাচে-কানাচে। নোহওয়েট শিকড় সেতুটি পর্যটন স্থল হিসেবে অত্যন্ত বিখ্যাত। সেখানে অন্যান্য শিকড় সেতুর তুলনায় প্রজাপতি, ড্রাগন ফ্লাই এবং জলে বাস করা কীটের সংখ্যা অনেক বেশি। কোনো শিকড় সেতুতেই উই পাওয়া যায়নি। গাছের কান্ডে মাকড়শার জাল দেখা গেছে।

শিকড় সেতুর সমীক্ষায় পাওয়া গেছে এফিমেরোপটেরার পাঁচটি প্রজাতি-ও (৩৫টি উদাহরণ)।

মেঘালয়ার এই শিকড় সেতুগুলিতে অভিযান জীব বৈচিত্র্য আবিষ্কারে যথার্থভাবে সাহায্য করেছে। এর ফলে ইউনেস্কো-র বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে এই সেতুগুলির স্বীকৃতির সমর্থনে তথ্যের-ও সামঞ্জস্য ঘটেছে। এই জীবিত সেতুগুলির প্রাণী বৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত সাযূজ্য ইউনেস্কো মনোনয়ন লাভের প্রস্তাবকে আর-ও মজবুত করেছে।