ওয়েব ডেস্ক; ১৬ জুলাই : আধুনিক সার্জারির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল মণিপাল হাসপাতাল, সল্টলেক। ৬০ বছর বয়সী এক মহিলার শরীরে ধরা পড়ে উন্নত স্তরের ওভেরিয়ান ক্যান্সার, যা পেটের ভেতর বিভিন্ন অংশ ছাড়িয়ে বুকের লসিকাগ্রন্থিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এই জটিল অবস্থাতেই হাসপাতালের চিকিৎসক দল সফলভাবে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
ওভেরিয়ান ক্যান্সার ভারতের নারীদের মধ্যে তৃতীয় সর্বাধিক ক্যান্সার এবং একে “নিঃশব্দ ঘাতক” বলা হয়, কারণ এটি প্রথম দিকে প্রায় উপসর্গহীন থাকে, ফলে অনেক সময়েই দেরিতে ধরা পড়ে। এরকম ক্ষেত্রে ক্যান্সার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরের প্রতিটি দৃশ্যমান ক্যান্সার কোষ সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া।

এই জটিল অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন ডঃ অরুণাভ রায়, কনসালট্যান্ট, গাইনিক অনকো-সার্জারি, মণিপাল হাসপাতাল, সল্টলেক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডঃ অরুণাশীষ মল্লিক ও ডঃ নেহা আগরওয়াল। রোগীর ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট এবং অ্যানেস্থেশিয়া অনুমোদনের পরে, চিকিৎসকরা একটি ‘আপফ্রন্ট র‍্যাডিকাল সার্জারি’ করার সিদ্ধান্ত নেন, যার লক্ষ্য ছিল ‘জিরো রেসিডুয়াল ডিজিজ’ – অর্থাৎ অস্ত্রোপচারের পরে শরীরে আর কোনও দৃশ্যমান ক্যান্সার কোষ থাকবে না।

রোগী রিনা গাঙ্গুলীর (নাম পরিবর্তিত) শরীর থেকে বাদ দেওয়া হয় বুকের লসিকাগ্রন্থি এবং পেটের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ক্যান্সারাস গাঁঠ ও কোষ। এর মধ্যে ছিল ডায়াফ্রাগম, অন্ত্র, ডিম্বাশয়, জরায়ু, পেলভিক ও ব্লাডার পেরিটোনিয়ামের অংশ। অস্ত্রোপচারে করা হয় ‘টোটাল ওমেন্টেকটমি’ (পেটের চর্বিযুক্ত আবরণ পুরোপুরি বাদ দেওয়া), ‘ডায়াফ্রাগম স্ট্রিপিং’ (ডায়াফ্রাগমের ক্যান্সার আক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া), ‘সিলেক্টিভ পেরিটোনেকটমি’ (শুধু আক্রান্ত অংশ কাটা), ‘রেক্টো-সিগময়েড রিসেকশন’ (বৃহৎ অন্ত্রের একাংশ কাটা) এবং ‘অ্যানাস্টোমোসিস’ (অন্ত্র কেটে বাদ দেওয়ার পর তা পুনরায় জোড়া লাগানো)। এছাড়াও, বাদ দেওয়া হয় ‘স্মল বাওয়েল মেসেন্টেরিক ডিপোজিট’ ও ‘রাইট কার্ডিওফ্রেনিক নোড’—যা অন্ত্র ও হৃদয়-ডায়াফ্রাগম সংযোগস্থলের আশেপাশে অবস্থিত লসিকাগ্রন্থি।

সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলা এই অস্ত্রোপচারে মাত্র এক ইউনিট রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। সার্জারির সময় রোগীকে স্থিতিশীল রাখেন অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞরা। সার্জারির পর রোগীকে আইসিইউ-তে রাখা হয় এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থানান্তর করা হয় এইচডিইউ-তে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। অস্ত্রোপচারের মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই তিনি হাঁটতে, স্নান করতে, স্বাভাবিক খাবার খেতে এবং শৌচাগার ব্যবহার করতে সক্ষম হন। কোনও জটিলতা ছাড়াই তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছাড়াও পান।
অস্ত্রোপচার সম্পর্কে ডঃ অরুণাভ রায় বলেন, “এটি ছিল একটি অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং কেস। আমাদের লক্ষ্য ছিল এমনভাবে অস্ত্রোপচার করা যাতে শরীরে কোথাও কোনও দৃশ্যমান ক্যান্সার কোষ না থাকে। এর জন্য নিখুঁত পরিকল্পনা, অপারেশন দক্ষতা এবং পুরো দলের সমন্বয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের টিম অসাধারণ ক্লিনিকাল ফলাফল দিয়েছে – খুব কম রক্তক্ষয় ও চমৎকার পোস্ট-অপারেটিভ রিকভারি।”