ওয়েব ডেস্ক; ২ এপ্রিল: লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গর রায়গঞ্জ স্টেশন নিয়ে সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পালের তোলা এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে রেল, তথ্য ও সম্প্রচার এবং ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছেন যে, রায়গঞ্জ স্টেশনে হাই-লেভেল প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্ম শেড, ওয়েটিং হল, পানীয় জলের ব্যবস্থা, প্রস্রাবাগার, শৌচাগার, বসার জায়গা ও ফুট ওভার ব্রিজের মতো সুযোগ-সুবিধাগুলি বর্তমানে উপলব্ধ রয়েছে।
সাংসদ তাঁর প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন যে, ‘অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্প’ (ABSS)-এর অধীনে স্টেশন নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার কি কি মানদণ্ড অনুসরণ করে; রায়গঞ্জ স্টেশন কি যাত্রীদের সংখ্যা, জেলা সদর বা আঞ্চলিক সংযোগের মতো শর্তগুলি পূরণ করে? এর পাশাপাশি, তিনি বর্তমান যাত্রী ধারণক্ষমতা, বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা, আয় এবং স্টেশনের শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কেও জানতে চান। সরকার রায়গঞ্জ স্টেশনকে পুনর্উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা (যেমন- এসকেলেটর, লিফট, ডিজিটাল পরিষেবা)- সহ আলাদা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করবে কি না এবং তার সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
উত্তরে মন্ত্রী জানান যে, রায়গঞ্জ স্টেশনটি এনএসজি-৪ (Non-Suburban Grade) ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে স্টেশন বিল্ডিং-এর শ্রীবৃদ্ধি, প্ল্যাটফর্ম শেড, ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ, ২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম চওড়া করা, ওয়েটিং হলের উন্নতি, ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে শৌচাগার নির্মাণ, সার্কুলেটিং এরিয়া এবং একটি ৬ মিটার চওড়া ফুট ওভার ব্রিজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ভারতীয় রেলে স্টেশনের আধুনিকীকরণ ও যাত্রী সুবিধাবৃদ্ধি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। অগ্রাধিকার এবং তহবিলের প্রাপ্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয়তা ভিত্তিতে এই কাজগুলি করা হয়।
বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা ও আয় সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে শ্রী বৈষ্ণব জানান, ২০২৪-২৫ সালে রায়গঞ্জ স্টেশনে বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা ছিল ২৩.৮৮ লক্ষ এবং ২০২৫-২৬ সালে (ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত) এই সংখ্যা ২৩.৭০ লক্ষ। অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে স্টেশনের আমূল পরিবর্তনের জন্য এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এর আওতায় মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে ধাপে ধাপে কাজ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে:
- স্টেশনে প্রবেশপথ ও সার্কুলেটিং এরিয়ার উন্নয়ন।
- শহরের উভয় প্রান্তের সাথে স্টেশনের সংযোগ স্থাপন।
- স্টেশন বিল্ডিং ও ওয়েটিং হলের আধুনিকীকরণ।
- পর্যাপ্ত শৌচাগার, বসার জায়গা ও পানীয় জলের ব্যবস্থা।
- যাত্রী সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চওড়া ফুট ওভার ব্রিজ বা এয়ার কনকোর্স।
- লিফট, এসকালেটর এবং র্যাম্পের ব্যবস্থা।
- প্ল্যাটফর্মের উপরিভাগ ও শেডের উন্নয়ন।
- ‘ওয়ান স্টেশন ওয়ান প্রোডাক্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পণ্যের কিয়স্ক স্থাপন।
- পার্কিং এরিয়া এবং অন্যান্য পরিবহণ মাধ্যমের সাথে সংযোগ।
- দিব্যাঙ্গ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুবিধা।
- উন্নত যাত্রী তথ্য ব্যবস্থা এবং এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জ ও ব্যবসার কাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা।
মন্ত্রী উল্লেখ করে বলেন যে, এই প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদে স্টেশনে ‘সিটি সেন্টার’ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বৈষ্ণবের তথ্য অনুযায়ী, অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে সারা দেশে এ পর্যন্ত ১,৩৩৮টি স্টেশন চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১০২টি স্টেশন রয়েছে, যার মধ্যে উত্তর দিনাজপুর জেলার আলুয়াবাড়ি রোড, ডালখোলা ও কালিয়াগঞ্জ স্টেশন অন্তর্ভুক্ত।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত স্টেশনগুলির তালিকা:
আদ্রা, আলিপুরদুয়ার জংশন, আলুয়ারবাড়ি রোড, অম্বিকা কালনা, আনারা, অন্ডাল জংশন, আন্দুল, আসানসোল জংশন, আজিমগঞ্জ, বাগনান, বালি, বালুরঘাট, ব্যান্ডেল জংশন, বনগাঁ জংশন, বাঁকুড়া, বরাভূম, বারাসাত, বর্ধমান, ব্যারাকপুর, বেলদা, বহরমপুর কোর্ট, বেথুয়াডহরি, ভালুকা রোড, বিন্নাগুড়ি, বিষ্ণুপুর, বোলপুর শান্তিনিকেতন, বার্নপুর, ক্যানিং, চন্দননগর, চাঁদপাড়া, চন্দ্রকোনা রোড, ডালগাঁও, ডালখোলা, ডানকুনি, ধুলিয়ান গঙ্গা, ধুপগুড়ি, দিঘা, দিনহাটা, দমদম জংশন, ফালাকাটা, গড়বেতা, গেদে, হলদিয়া, হলদিবাড়ি, হরিশ্চন্দ্রপুর, হাসিমারা, হিজলি, হাওড়া জংশন, জলপাইগুড়ি, জলপাইগুড়ি রোড, জঙ্গিপুর রোড, ঝালদা, ঝাড়গ্রাম, জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কালিয়াগঞ্জ, কল্যাণী, কল্যাণী ঘোষপাড়া, কামাখ্যাগুড়ি, কাটোয়া জংশন, খাগড়াঘাট রোড, খড়গপুর জংশন, কলকাতা, কৃষ্ণনগর সিটি জংশন, কুমেদপুর জংশন, মধুকুন্ডা, মধ্যমগ্রাম, মালদা কোর্ট, মালদা টাউন, মেচেদা, মেদিনীপুর, নবদ্বীপ ধাম, নৈহাটি জংশন, নিউ আলিপুরদুয়ার, নিউ কোচবিহার, নিউ ফারাক্কা জংশন, নিউ জলপাইগুড়ি জংশন, নিউ মাল জংশন, ওন্দাগ্রাম, পানাগড়, পাণ্ডবেশ্বর, পাঁশকুড়া জংশন, পুরুলিয়া জংশন, রামপুরহাট জংশন, রানাঘাট, সাঁইথিয়া জংশন, শালবনি, শামসি, সাঁতরাগাছি, শিয়ালদহ, শালিমার, শান্তিপুর, শেওড়াফুলি জংশন, শ্রীরামপুর, শিলিগুড়ি জংশন, সীতারামপুর, সিউড়ি, সোনারপুর জংশন, সুইসা, তমলুক, তারকেশ্বর, তুলিন ও উলুবেড়িয়া।
সম্পন্ন হওয়া স্টেশন:
পশ্চিমবঙ্গে অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের কাজ বেশ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যেই ১০টি স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলি হলো: আনরা, বরাভূম, হলদিয়া, হলদিবাড়ি, জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন, কল্যাণী ঘোষপাড়া, কামাখ্যাগুড়ি, পানাগড়, সিউড়ি এবং তমলুক।
অন্যান্য স্টেশনের অগ্রগতির চিত্র নিম্নরূপ:
- আলুয়াবাড়ি রোড: ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণ, রাস্তা এবং সীমানা প্রাচীরের কাজ শেষ। স্টেশন ভবন ও ১২ মিটার চওড়া ফুট ওভার ব্রিজের কাজ চলছে।
- বালুরঘাট: স্টেশন বিল্ডিং, পোর্টিকো, প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ ও ওয়েটিং রুমের কাজ শেষ। লিফট ও ১২ মিটার চওড়া ফুট ওভার ব্রিজের কাজ চলছে।
- ডালখোলা: প্ল্যাটফর্ম শেড ও ফুট ওভার ব্রিজের কাজ শেষ। লিফট ও সার্কুলেটিং এরিয়া বা পারিপার্শিক এলাকার কাজ চলছে।
- জলপাইগুড়ি: ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের কাজ ও ফুট ওভার ব্রিজের কাজ শেষ। বর্তমানে এসকালেটর ও লিফট বসানোর কাজ চলছে।
- কালিয়াগঞ্জ: প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বৃদ্ধি ও শেডের কাজ সম্পন্ন। স্টেশন বিল্ডিং ও লিফটের কাজ চলছে।
রেলমন্ত্রী জানান, জোনাল রেলওয়ের প্রস্তাব এবং পর্যটন বা তীর্থস্থানের গুরুত্ব বিবেচনা করে স্টেশন নির্বাচন করা হয়। কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেলের উন্নয়নমূলক কাজ অত্যন্ত জটিল এবং এখানে যাত্রী নিরাপত্তা ও নানা বিধিবদ্ধ অনুমতির (যেমন- পরিবেশ বা হেরিটেজ ক্লিয়ারেন্স) বিষয় থাকে। এছাড়া, মাটির নিচে থাকা ইউটিলিটি লাইন সরানো এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রেখে কাজ করার মতো চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক সময় গতি কিছুটা প্রভাবিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গ মূলত চারটি রেলওয়ে জোনের অধীনে (পূর্ব রেল, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল, দক্ষিণ-পূর্ব রেল এবং মেট্রো রেল)। এই জোনগুলির জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ১,১৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১,২৩১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
