ওয়েব ডেস্ক; ২৩ জুন : ২০২৬ সালের দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে ভারত ও বিশ্বজুড়ে অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখা গেছে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার লক্ষ্যে একটি বিশ্বজনীন আন্দোলন হিসেবে যোগের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিসরে যোগব্যায়াম প্রদর্শনী ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল; এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডে ৩৫,০০০ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এ বছরের মূল বিষয় ছিল “সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ”; এটি শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও সামগ্রিক সুস্থতার ক্ষেত্রে যোগের ভূমিকাকে তুলে ধরেছে এবং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে যোগকে গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘আইডিওয়াই ২০২৬’-কে একটি প্রকৃত বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত করার জন্য বিশ্বের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, মিশর এবং আরও অনেক দেশ সহ বিভিন্ন মহাদেশে যোগব্যায়াম কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। নিউ ইয়র্কে অবস্থিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার প্রধান শহরগুলি পর্যন্ত – সর্বত্রই মানুষ এই উদযাপনে শামিল হয়েছেন। এটি স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও সমষ্টিগত কল্যাণের সেতুবন্ধন হিসেবে যোগব্যায়ামের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন।
আয়ুষ মন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী প্রতাপরাও যাদব দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে অত্যন্ত সফল করে তোলার ক্ষেত্রে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিক, যোগব্যায়াম অনুশীলনকারী, স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণকারীদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, “সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ” বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্বাস্থ্য, সম্প্রীতি ও সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যোগের ভূমিকাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। পাশাপাশি, তিনি একটি স্বাস্থ্যকর ও সুখী ভবিষ্যতের লক্ষ্যে দৈনন্দিন জীবনে যোগব্যায়ামকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
ভারতে আয়োজিত এই উদযাপনে দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে আয়োজিত গণ-যোগব্যায়াম প্রদর্শনীতে অংশ নেন এবং উপ-রাষ্ট্রপতি সি. পি. রাধাকৃষ্ণন লাদাখের লেহ-তে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপনে যোগ দেন। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা সংসদ ভবন চত্বরে সাংসদদের নিয়ে একটি যোগব্যায়াম পর্ব পরিচালনা করেন।
দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল আয়ুষ মন্ত্রকের অধীনে মোরারজি দেশাই ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ যোগ এবং ন্যাশনাল আয়ুষ মিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর” অভিযান। গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত প্রায় ২,৫২৫ কিলোমিটার পথ জুড়ে আয়োজিত এই অভিযানের মাধ্যমে ঋষিকেশ, হরিদ্বার, প্রয়াগরাজ, বারাণসী, পাটনা ও হুগলির বিভিন্ন বিখ্যাত ঘাটে ‘কমন যোগ প্রোটোকল’ সেশন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। ভারতের দুটি মহান সভ্যতার ঐতিহ্য, পবিত্র গঙ্গা নদী এবং প্রাচীন যোগব্যায়ামকে প্রতীকীভাবে একত্রিত করে এই উদ্যোগটি নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলির মধ্যে “সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগ” এবং সামগ্রিক সুস্থতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় রেড রোডে আয়োজিত মূল আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬ উদযাপনের প্রাক্কালে, গণ অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজ্যে যোগ-কেন্দ্রিক নানা প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। “দৌড় সে ধ্যান” শীর্ষক উদ্যোগের আওতায় কলকাতার এগারোটি স্থানে ম্যারাথনের আয়োজন করা হয়, যা নাগরিকদের যোগব্যায়াম ও সুস্থ জীবনধারা গ্রহণে উৎসাহিত করে। এছাড়া হুগলি নদীর তীরে “বন্দে যোগম” এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল; যার মধ্যে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, শিল্পকলা ও আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা প্রভৃতি। প্রায় ৩,০০০ ড্রোন নিয়ে আয়োজিত এক বিশাল ড্রোন শো ভারতের যোগ-যাত্রাকে তুলে ধরার পাশাপাশি বিশিষ্ট যোগগুরুদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে, যা যোগ দিবসের আগে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
দিল্লির লাল কেল্লা, উত্তরাখণ্ডের হর কি পৌরি, ওড়িশার কোনার্ক সূর্য মন্দির, কর্ণাটকের হাম্পি স্মৃতিস্তম্ভসমূহ, লাদাখের লেহ প্রাসাদ, তামিলনাড়ুর মহাবালিপুরম উপকূল মন্দির, উত্তরপ্রদেশের সারনাথ, আসামের শিলচরের কাছারি দুর্গ, তেলেঙ্গানার হায়দ্রাবাদের চারমিনার চত্বর, মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ের গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, বিহারের নালন্দা মহাবিহার, গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতী রিভারফ্রন্ট এবং আরও অন্যান্য স্থানে আয়োজিত যোগব্যায়াম কর্মসূচির মাধ্যমে এই উদযাপন দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
‘জন-অংশীদারিত্ব’ বা ‘জন ভাগিদারী’-র চেতনাকে তুলে ধরে, ‘আয়ুষ গ্রিড’-এর তৈরি ‘যোগ সঙ্গম পোর্টাল’-এ ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৭৮০টি জেলা জুড়ে ৩.০৭ কোটিরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। দেশ জুড়ে আয়োজিত যোগব্যায়াম কর্মসূচিগুলির ৭.৪৬ লক্ষেরও বেশি ছবি এই পোর্টালে আপলোড করা হয় এবং ২.৬৬ লক্ষেরও বেশি অংশগ্রহণ শংসাপত্র তৈরি করা হয়।
এই উদ্যোগটি ৪.২৪ লক্ষ সরকারী প্রতিষ্ঠান, ২.৪৬ লক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং অন্যান্য সব পক্ষ সহ সারা বিশ্বে ৭.৬৪ লক্ষেরও বেশি সংস্থা থেকে নিবন্ধন পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ (৩.৪৫ লাখ সংস্থা), রাজস্থান (১.৬৭ লাখ), মধ্যপ্রদেশ (৩৪,৭৪২), আসাম (২৫,২৮৫) এবং উত্তর প্রদেশ (২২,২৮৫) শীর্ষস্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যুক্ত হয়েছে। যোগ বিলবোর্ড সুবিধাটি ১৫,০০০টিরও বেশি ছবি পেয়েছে।
১৪ জুন ২০২৬-এ, আয়ুষ মন্ত্রক একটি YouTube লাইভ যোগ স্ট্রিমের জন্য সর্বাধিক দর্শকদের জন্য একটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অর্জন করেছে, যেখানে ৪,৩৫,৮৩১ জন দর্শক অফিসিয়াল YouTube চ্যানেলের মাধ্যমে একটি বিশ্বব্যাপী অনলাইন যোগ সেশনে যোগদান করেন।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে সরকারের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক, অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রক, আবাসন ও নগর বিষয়ক মন্ত্রক, জল শক্তি মন্ত্রক, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রক, লোকসভা সচিবালয়, সিবিআই, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, সিআইএসএফ , ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা এবং ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার মতো বিভিন্ন মন্ত্রক ও বিভাগ সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে সুস্থতা, রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সুস্থ বার্ধক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের উদ্যোগে দেশজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠান পালিত হয়। সিয়াচেন হিমবাহ থেকে শুরু করে কন্যাকুমারী, কচ্ছের রান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ এবং সমুদ্রে মোতায়েন নৌ-বাহিনীর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যোগব্যায়াম সেশনের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং, সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় আধিকারিক এবং হাজার হাজার কর্মী এই উদযাপনে অংশ নেন। ভারতীয় স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং কোস্ট গার্ড তাদের বিভিন্ন কমান্ড বা ইউনিটের অধীনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিরাও এই উদযাপনে শামিল হন, যা যোগব্যায়ামের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতাকে তুলে ধরে।
বিশ্বজুড়ে যোগব্যায়ামকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের যাত্রাপথে ২০২৬ সালের ১২তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস আরও একটি মাইলফলক হয়ে রইল। সাধারণ নাগরিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী, যুব সংগঠন এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দিবসটি শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, আবেগীয় ভারসাম্য ও সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়ামের কালজয়ী ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করেছে; পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক সুস্থতার প্রসারে ভারতের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
