ওয়েব ডেস্ক; ২৪ জুন : অভ্যন্তরীণ মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়নে এক বড় সাফল্য হিসাবে, ব্যারাকপুরের আইসিএআর–সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICAR-CIFRI) ‘ওয়ার্ল্ডফিশে’র সহযোগিতায় বাস্তবায়িত বিজ্ঞানভিত্তিক মৎস্য সম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে চামতা জলাভূমিতে উচ্চমূল্যের দেশী ট্যাংরার সংখ্যা পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছে।

এই সাফল্যটি জলাভূমিতে আয়োজিত ফিশ হারভেস্ট মেলা এবং বিজ্ঞানী–মৎস্যজীবী মতবিনিময় কর্মসূচিতে তুলে ধরা হয় সম্প্রতি। সেখানে ছয় মাসব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক পেন কালচার কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৮৭ কেজি দেশীয় ক্যাটফিশ (Mystus cavasius) সংগ্রহ করা হয়। গড়ে ২.২৮ গ্রাম ওজনের পোনা ছাড়া হলেও সংগ্রহের সময় তাদের গড় ওজন দাঁড়ায় ৩৩.৬ গ্রাম। পরে, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এই মাছগুলি জলাভূমিতে মুক্ত করা হয়।
এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর অধিকর্তা ড. প্রদীপ দে বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে দেশীয় মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উন্নয়নের প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু ক্ষয়প্রাপ্ত জলাভূমির পুনরুজ্জীবন এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণই করে না, পাশাপাশি, মৎস্যজীবীদের আয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা জোরদার করতেও সহায়তা করে। ড. দে আরও বলেন, সমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ টেকসই জীবিকা, পরিবেশগত সহনশীলতা এবং একটি শক্তিশালী নীল অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ‘বিকশিত ভারত @২০৪৭’-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর জলাধার ও জলাভূমি মৎস্য বিভাগ-এর প্রধান ড. আর. কে. মান্না সারা দেশে সুস্থায়ী মৎস্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রসার ত্বরান্বিত করতে ধারাবাহিক জ্ঞান বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

চামতা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপক শ্রী প্রণয় বালা বলেন, এই উদ্যোগ স্থানীয় মৎস্যজীবীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। একইসঙ্গে, জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে মূল্যবান দেশীয় মাছের প্রজাতি পুনরুদ্ধারেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই উদ্যোগ দুটি উচ্চমূল্যের দেশী ট্যাংরা প্রজাতি- Mystus cavasius এবং Mystus tengara-এর পরিবেশগত পুনরুদ্ধারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই অভিনব কৌশলের আওতায় প্রথমে সুরক্ষিত পেন বা বেষ্টিত জলাধারের মধ্যে মাছের পোনা প্রতিপালন করা হয়। পরে সেগুলিকে উন্মুক্ত জলাভূমিতে অবমুক্ত করা হয়, যার ফলে, মাছের বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি পায় এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে সফলভাবে স্থায়ী হতে সাহায্য করে।
আইসিএআর-সিআইএফআরআই সর্বাঙ্গীণ কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। এর মধ্যে ছিল এইচডিপিই (HDPE) খুঁটি ও শিকারি-প্রতিরোধী জাল ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পেন নির্মাণ, জল ও মাটির গুণগত মানের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, মাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ভাসমান খাদ্য সরবরাহ। এছাড়াও, স্থানীয় মৎস্যজীবীদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছকে খাদ্য প্রদান, পেনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে সংরক্ষণ কর্মসূচিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি, এই উদ্যোগ জলাভূমিনির্ভর সম্প্রদায়গুলির জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করেছে। Mystus tengara-এর বাজারমূল্য ভারতীয় প্রধান কার্প (Indian Major Carps)-এর তুলনায় চার গুণেরও বেশি। অন্যদিকে, Mystus cavasius-এর মূল্য প্রায় তিন গুণ বেশি হওয়ায় মৎস্যজীবীরা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি আর্থিক লাভের সুযোগ পাচ্ছেন।

চামতা মডেলকে এখন সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ মৎস্য ব্যবস্থাপনার একটি সম্প্রসারণযোগ্য উদাহরণ হিসাবে দেখা হচ্ছে, যেখানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে টেকসই জীবিকা সৃষ্টির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ জলজ বাস্তুতন্ত্রে ক্ষুদ্র দেশীয় মাছের প্রজাতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এই মডেল একটি কার্যকর রূপরেখা হিসাবে কাজ করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed