সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বিপন্ন শৈশব: আমাদের দায়িত্ব
সমাজ ও সম্প্রদায়- একটি শিশুর মানসিক বিকাশে এক বৃহৎ ভূমিকা পালন করে থাকে। কোন শিশুর বেড়ে ওঠার সময় সুষ্ঠ, শান্ত পরিবেশ, নিরাপদ আবহ ভবিষ্যতে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে এই বিশ্বের অসংখ্য শিশু সেই ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সন্ত্রাস হল এমনই একটি দিক যার সংস্পর্শ শৈশবের বিকাশের সমস্ত দ্বারই প্রায় চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়; মূলতঃ জীবনের শুরুতেই তারা যে নির্মল দৃষ্টি নিয়ে এই পৃথিবীকে চিনতে, বুঝতে শুরু করেছিল, সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই আমূল পরিবর্তন ঘটে, এবং এই পরিবর্তন কখনও স্বাভাবিক নয়, বা অভিপ্রেতও নয়। ঘটনা ছোট হোক বা বড়, নিজের প্রতিবেশীদের মধ্যেই হোক বা যুদ্ধের আবহেই হোক, নিজের চোখে দেখা বা কানে শোনা – যেকোন রকম সাম্প্রদায়িক হিংসাত্মক ঘটনা একটি শিশুর কোমল অন্তরে প্রচন্ড আলোড়ন তুলতে পারে।
হিংসার প্রতিক্রিয়া কি?’হিংসায় হিংসার শেষ হয়না।’ শৈশবে যে মারাত্মক হিংসার সম্মুখীন হয়েছে, বড় হয়ে তার পক্ষে হিংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল – বিভিন্ন গবেষণায় তা উঠে এসেছে। অত্যন্ত নৃশংস আতংকবাদী হানাগুলির ক্ষেত্রে দেখা যায়, হামলাকারীদের অনেকেই শৈশবে হিংসা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। শৈশবের আতঙ্কের নির্মম যাঁতাকলের চক্র থেকে তারা কোনদিনই বেরিয়ে আসতে পারেনি। জঙ্গি কার্যকলাপে সকলেই সামিল না হলেও অসংখ্য শিশু তাদের বাকি জীবন নানা জটিল মানসিক সমস্যা নিয়েই বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়, যেমন- অবসাদ, উদ্বেগ, Post Traumatic Stress Disorder (PTSD), নেশাগ্রস্ততা, আত্মহননের প্রবণতা, ইত্যাদি তাদের নিত্যসঙ্গী। মানবতার প্রতি, ভালোবাসার প্রতি, পরিবার তথা সামাজিক বন্ধন ও নিরাপত্তার প্রতি তাদের বিশ্বাস, আস্থা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যায় চিরতরে। বুদ্ধির বিকাশের সবচেয়ে মোক্ষম স্তরটি হল শৈশব ও কৈশোর। আতঙ্কের অন্ধকার একটি শিশুকে এমনভাবে শ্বাসরোধ করে দেয়, যে তার স্বাভাবিক বিকাশ কখনই সম্ভব হয়না, হিংসা তার চিরসঙ্গী হয়ে যেতে থাকে।
কোন জাতির বা দেশের পক্ষে এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। কারন শিশুরাই তো জাতির ভবিষ্যৎ। সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে কোনদিন কারুর লাভ হয়নি, বরং ভবিষ্যতের প্রজন্মের মানসিকতা সম্পূর্ণ ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ইউনিসেফ, হু (WHO), চিলড্রেন এন্ড আর্মড কনফ্লিক্ট (CAAC) এর মত অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সমস্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত, দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ, অনাথ, অসহায় শিশুদের উদ্ধার করতে, তাদের বিপন্ন শৈশবকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকায়, সিরিয়ায়, মায়ানমারে। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে আমাদের দেশের ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর কম্যুনাল হারমোনি (NCCH), যার লক্ষ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সর্বহারা শিশুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিরলস সংগ্রাম। ১৯৯২-এ পার্লামেন্টে বাজেট অধিবেশনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী (উত্তরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) ডঃ মনমোহন সিং খুব প্রাঞ্জলভাবে বলেছিলেন, ‘সমাজবিরোধী আর ভ্রান্ত মৌলবাদী শক্তিগুলির জঘন্য কার্যকলাপের সহজতম শিকার হয় তারা (শিশুরা)। এই সমস্ত শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে, তাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলার্থে, বিশেষত তাদের সুশিক্ষার জন্য সরকার ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর কম্যুনাল হারমোনি নামের এই স্বতন্ত্র ও অ-সরকারী সংস্থার প্রস্তাবনা পেশ করছে।’ মূলত, দানের উপরেই এটি নির্ভর করে এই সে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। প্রতিবছরের মত এই বছরও সংস্থাটি ১৯ থেকে ২৫ শে নভেম্বর এক সপ্তাহ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিমূলক প্রচার আর অনুদান সংগ্রহের বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এর নাম ‘সাম্প্রদায়িক ঐক্যের সপ্তাহ’। নানান অনুষ্ঠানে পালিত হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ফ্ল্যাগ ডে, আগামী ২৪শে নভেম্বর। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অনাথ শিশুদের এই সপ্তাহে রাজধানী দিল্লীতে নিয়ে আসা হয়, তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা বলে, আর আপামর দেশবাসীকে অনুরোধ করে শান্তির, সম্প্রীতি ও জাতীয় সংহতির পথে চলতে। ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত থাকেন। সেই ছোট ছোট শিশুরা তাদের পতাকা ঐ সব বিশিষ্ট মানুষদের পোশাকে লাগিয়ে দেয়। বাকি সময়টা তারা একসঙ্গে দিল্লীর বিভিন্ন জায়গায় বেড়িয়ে আসে।
