ওয়েব ডেস্ক; ১৬ জানুয়ারি; দেবাঞ্জন দাস: মহামারী আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে। স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে মহামারীর পরবর্তী সময়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে নজর কেড়েছে তা হলো মানসিক স্বাস্থ্য। প্রায় দু বছর সময় ধরে মানুষ ছিল গৃহবন্দী। দৈনন্দিন জীবন যাত্রার মধ্যেও ফ্যামিলি কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে একটু আনন্দতে বাঁধ সেজেছে মহামারী। এছাড়া অফিসে গিয়ে কাজ কর্মের জায়গায় বাড়ি থেকে কাজের প্রবণতা বেড়েছে অনেকাংশে।
বহু বেসরকারি সংস্থায় মাসিক বেতনে ঘাটতি হয়েছে শুধু তাই নয় তার সঙ্গে ছাটাই হয়েছেন বহু কর্মী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সারা বিশ্ব জুড়ে বহু বেসরকারি সংস্থার কর্মী ছাঁটাই হয়েছেন। এবং সেই কর্মী ছাটাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস থেকেই এক প্রভাব পড়েছে মানসিক স্বাস্থ্যে। সারা বিশ্বে ২৫ শতাংশ বেড়েছে ডিপ্রেশন। এছাড়া পরিসংখ্যান বলছে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির শিকার হয়েছেন ১০ লক্ষের বেশি মানুষ। তার সঙ্গে বিভিন্ন দেশে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা।
বহু মানুষ নিজেদের পছন্দের চাকরি ছেড়ে অপছন্দের চাকরি করছেন। ছোটবেলা থেকে গড়ে তোলা নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের হাল ধরতে কাজ করছেন। অনেকে আবার নিজের স্বপ্নের চাকরি করছেন কিন্তু যত দিন যাচ্ছে সেই চাকরি যেন তাদের কাছে এক বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জীবনের এবং মনের টানাপোড়েন, পারিবারিক শান্তি , মানসিক বিরাম্বনা নিয়ে
এমনই এক প্রেক্ষাপটে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘চৌকাঠ পেরিয়ে’ তৈরি করলেন পরিচালক ড: তন্বী চৌধুরী। পেশায় তিনি অধ্যাপিকা হলেও ছবি তৈরি এবং সমাজকে নিয়ে ছবি তৈরি কিন্তু তার অন্যতম আবেগ বলা যেতে পারে।
ছবির প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ছবির অন্যতম মূল চরিত্র ডাক্তার ‘ A ‘, যিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমেরিকা নিবাসী একজন মহিলার কাছে তিনি ভারতের করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। তার সাথে ডাক্তার A এর বাড়িতে উপস্থিত হওয়া বেশ কিছু চরিত্র। যারা জীবনের প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন বাধা, কষ্ট ভেঙে যাওয়া বিভিন্ন সম্পর্ক গুলির সম্মুখীন হয়েছেন। একাধারে দেখতে গেলে সমস্ত চরিত্রই মানষিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয়ের শিকার ।
সমাজের নিচু স্তর থেকে উঁচুস্তরের প্রত্যেকটি স্তরের মানুষের চরিত্র রয়েছে এই ছবিতে।
যেমন- ট্যাক্সিচালক আব্দুল চাচা, উঁচুস্তরের এবং জীবিকার কারণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া ডাক্তার বিষ্ণু সিং, খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার মাহি, সনামধন্য নৃত্যশিল্পী সুহাসিনী, যশ নামক এক শিল্পী ও তার সংগীতশিল্পী বন্ধু ড্যানিয়েল।
ছবির প্রত্যেকটি চরিত্র যারা ডাক্তার A এর বাড়িতে এসেছেন অনলাইনে এক সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য। সেই সাক্ষাৎকারের আগে নিজেরা কি কি তথ্য তুলে ধরবেন সংক্ষিপ্ত সময়ে সেই বিষয়ে নিজেদের মধ্যে একটু আলাপ-আলোচনা করে নিচ্ছেন। সেই আলাপ আলোচনার সূত্রেই প্রত্যেকেই নিজে নিজের জীবনের ফেলে আসা সময় বিভিন্ন অপমান কিছু সুখের কিছু দুঃখের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
ছবিটি শুরুর দিকে কিছুটা স্লো মুভমেন্ট হলেও ছবিটি যত এগোচ্ছে তার রহস্যময়তা এবং তার বিষয়বস্তু বোঝা যাচ্ছে। ছবিটিতে যে চরিত্র নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলি, বর্তমান সময় নিয়ে আলোচনা করছে তা আরো একটু যদি বিস্তারিত করা যেত তাহলে হয়তো ভালো হতো। এছাড়া টেকনিক্যাল বিভিন্ন অংশ যেমন কালার কারেকশন, পয়েন্ট অফ ভিউ, লাইট ব্যালেন্স একটু ফেড মনে হয়েছে।
ছবি চলাকালীন একটি অন্যতম প্রধান চরিত্র ডাক্তার বিষ্ণু সিং, ডাক্তার হওয়ার পর রোগী দেখতে দেখতে তিনি অজান্তেই কখন এক মানসিক রোগের শিকার হয়ে পড়েছেন সেটা তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি। এই ডাক্তার হওয়া এবং সেখান থেকে একটা মানসিক রোগী এই সময়টুকু পরিচালক যদি দেখাতেন তাহলে হয়তো আর একটু জমতে পারতো।
ডাক্তার A এবং আমেরিকা নিবাসী একজন মহিলার কথোপকথনের সময় যদি আরেকটু কমানো যেত এবং বাকি সমস্ত চরিত্রের বিষয়বস্তুকে আরেকটু বিস্তৃত করা যেত তাহলে হয়তো গল্প জমে যেত। গল্পে ব্যবহৃত চরিত্র নৃত্যশিল্পী সুহাসিনীর চরিত্র বেশ অ্যাডভান্স লেগেছে আমার।
সর্বোপরি বর্তমান এই পরিস্থিতির ওপর অনেক ধরনের ছবি হলেও তন্বী চৌধুরীর এই ছবিটি দর্শকদের মন কাড়বে বলে ই আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য।
ছবিতে রয়েছে বিভিন্ন সম্পর্কের টানা পড়েন। সম্পর্ক ভাঙার গল্প, অনিচ্ছা থাকলেও সেই জিনিসকে নিয়ে এগিয়ে চলার গল্প। সমাজের চোখে যে সম্পর্ক অনৈতিক সেই গল্প ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক তন্বী চৌধুরী। এই ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ঋষভ বসু, অনাংশা বিশ্বাস, শতাক্ষী নন্দী, শংকর দেবনাথ, রিয়ান ঘোষ, পলাশ চতুর্বেদী, অপরাজিতা ইয়োলমো এবং পারমিতা সেন।
ছবিটিতে বোস্টনের বহু মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। যেমন ফিলোমেলা ব্যান্ডটির সমস্ত সদস্য বোস্টন নিবাসী এবং সমস্ত মানুষ ভারত থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বোস্টনে কর্মরত। তাদের মধ্যে আই আই টির প্রাক্তনীও আছেন। তাদেরই অবদানে ছবিটির গান “শেষ ইচ্ছে” সুমর্যাদায় পেশ করা গেছে।
(ছবির রিভিউ লেখকের ব্যক্তিগত মন্তব্য)
