সজলকান্তি দাশগুপ্ত
প্রথম পর্বের পর…..
ইনি জাতিতে ছিলেন ক্ষত্রিয় কিন্তু ধর্মান্বেষণে প্রবৃত্ত হয়ে তিনি ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি ঈশ্বর প্রেমিক এবং সুফি সম্প্রদায়ের দরবেশদের মত দিনরাত ভাবসাধনে নিযুক্ত থাকতেন। দক্ষিণেশ্বরের কালী বাড়ি তার কাছে ভাব সাধনের উপযুক্ত স্থান বলে মনে হলো। পঞ্চবটির বৃহচ্ছায়ায় তিনি আসন পেতে থাকতে লাগলেন।
প্রেমিক গোবিন্দকে দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ আকৃষ্ট বোধ করলেন। একদিন তিনি এসে আলাপ করার পর গোবিন্দর প্রবল বিশ্বাস এবং প্রেমে তিনি মুগ্ধ হলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবতে লাগলেন ‘মুসলমান ধর্মও তো ঈশ্বর লাভের একটি পথ। অনন্ত লীলাময়ী মা এ পথ দিয়েও তো কত লোককে তাঁর শ্রীপদপদ্ম লাভ করিয়ে ধন্য করেছেন। কীভাবে তিনি এটা করেন দেখতে হবে। এইসব চিন্তা করে তিনি ঠিক করলেন যে গোবিন্দর কাছে দীক্ষা নিয়ে তিনি এই সাধনায় নিযুক্ত হবেন।
যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। শ্রীরামকৃষ্ণ গোবিন্দের কাছে দীক্ষা নিয়ে ঈশ্বর সাধনায় ব্রতী হলেন। তিনি যখন যে ভাবে সাধনা করেছেন, তখন তার মত পোশাক পরেছেন। এবার তিনি মুসলমানদের মতো কাছা খুলে কাপড় পরলেন। সারাদিন ”আল্লাহ” মন্ত্র জপ করতে লাগলেন, ত্রিসন্ধ্যা নামাজ পড়তে লাগলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মন থেকে হিন্দু ভাবনা পুরোপুরি দূর হয়ে গেল। হিন্দু দেব-দেবীদের প্রণাম করা তো দূরের কথা, দর্শন করবার ইচ্ছা মনে জাগতো না। মুসলমানদের প্রিয় খাবার এমনকি গোমাংস পর্যন্ত তাঁর খেতে ইচ্ছে জাগলো। শ্রীরামকৃষ্ণ গরুর মাংস খেতে চেয়েছেন একথা শুনে মথুরমোহন খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি ছুটে এলেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। তাকে কাতরভাবে বললেন, ‘বাবা আর যাই করো গোমাংস তুমি খেয়ো না। আমি মুসলমান পাচক এনে তাদের পদ্ধতিতে রান্না করে খাওয়াচ্ছি।’ কথামতো মথুরবাবু মুসলমান পাচক এনে তার নির্দেশমতো ব্রাহ্মণের দ্বারা নানা মুসলমানি পদ রান্না করে শ্রীরামকৃষ্ণকে খাবার ব্যবস্থা করেন। তবে এই সময়টিতে তিনি একটিবারের জন্যেও মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেননি। মন্দিরের বাইরে মথুরবাবুর কুটিরে থাকতেন। এইভাবে তিন দিন কেটে গেল। শ্রীরামকৃষ্ণদেব রোজকার মতো আল্লাহ: মন্ত্র জপ করছেন। হঠাৎ তার সামনে অপূর্ব সুন্দর দীর্ঘশজ্ঞ বিশিষ্ট এক গম্ভীর জ্যোতির্ময় পুরুষ আবির্ভূত হলেন। এরপর তাঁর মন স্বগুণ ব্রহ্মা উপলব্ধি পূর্বক তুরীয় নির্গুণ ব্রহ্মে লীন হয়ে গেল। এর ফলে শ্রীরামকৃষ্ণের ইসলাম সাধনারও পরিসমাপ্তি ঘটল।
সমাপ্ত….
