সঞ্জয় চক্রবর্তী
তৃতীয় পর্বের পর……
নৌকা ঘাটে লাগাতেই সব হই হই করে ছুটে এলো ঘাটের কাছে। যেন কত দিনের পরিচিত। দু চোখ দিয়ে জল নেমে এলো আমার। কিছু বোঝার আগেই দেখি গদাই নেমে গেছে পাড়ে। আর ওর সেই সেটিং এর ৪-৫ জনকে নিয়ে ধাক্কা মেরে বলছে,
-কাউকে কিছু না দিয়ে ফিরে যাব চলো সবাই ওদিকে।
আমি আর থাকতে পারলাম না। বলে উঠলাম, -আরে আরে গদাই ও রকম ব্যবহার করিস না রে ভাই। তুই জানিস না ভাই কত অনাহারের জ্বালায়, কত অসুবিধায় পড়লে তবে একটা মানুষ সপরিবারে দুমুঠো অন্নের জন্য মাথা নিচু করে অন্যের কাছে হাত পাতে। এ যে কি লজ্জা রে ভাই যার কপালে জোটে শুধুমাত্র সেই জানে। ওদের সঙ্গে একটু ভালো ব্যবহার করে দেখ। খিদের জ্বালা যে কিরে ভাই আমরা তো বিন্দুবিসর্গ জানিনা। কিন্তু ওদের দিকে একটু তাকিয়ে দেখ দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে ……. – কতদিন অভুক্ত থাকার পর হয়তো একদিন কিছু আহার জোটে ওদের। কিন্তু তাও উদর ভর্তি হয় না। আর তুই ওদের ধাক্কাধাক্কি করছিস?? তোর হাতের একটা ধাক্কা খেয়ে ওদের দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও নেই। গদাই হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,
-দাদা তুমি আবার সেন্টি হয়ে গেলে। সরি দাদা, ভেরি সরি। আসলে একটু শক্ত না হলে সামলাতে পারবো না গো । যাক, তুমি চলো তো নিজে পাশে থেকে যা বলবে তাই করব। চলো, চলো তাড়াতাড়ি মালগুলো পাড়ে নামিয়ে এক জায়গায় জড়ো করি। দাদা তুমি ওদের বুঝিয়ে লাইনটা সামলাও। না হলে কাকে পাঠাবো আবার সে আবার ওদের গালাগালি দিয়ে দেবে। ভাই সবাই রেডি হ… শুরু করে দেবো তাড়াতাড়ি শেষ করে ফিরতে হবে।
সবাই কাজে লেগে পড়ল। আমিও লাইনে সবাইকে বুঝিয়ে সামলাতে লাগলাম। খুব যেন একটা আত্মসন্তুষ্টি হচ্ছিল। ভীষণ ভালো লাগছিল যখন খাবার পাওয়ার পর ওদের মুখের হাসি দেখলাম।
কেউ হয়তো ভাবছে, আজ কয়েকদিন পর সন্তানের মুখে একটু অন্ন তুলে দিতে পারবে। আবার কেউ চিন্তা করছে, তার পরিবার আজ অনেকদিন পর পেট ভরে খাবে। তার সাথে কেউ তার বুড়ো মা-বাবাকে খাওয়াবে বলে ছুটে চলে গেল মাঠ, পাহাড় হয়ে দূরে কোথায়। আজ ওদের সকলের মনের ভাবনাগুলো যেন আমার চোখের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল জল রং দিয়ে আঁকা ভেজা ছবির মত। যেন কেউ একজন অধীর হয়ে আমার চোখের পাতার ওপর বুলিয়ে দিচ্ছিল ঠান্ডা রংয়ের ভেজা তুলি আর আমি চোখের পাতা খুললেই যেন দেখছিলাম ওদের সকলের ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।
কোন মা অনেকদিন পর পরম আনন্দে তার সন্তানদের একসাথে পাশাপাশি বসিয়ে পেটভরে খেতে দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে গালে হাত দিয়ে মনের আনন্দে চোখে জল ফেলছে। যেন কোন বৃদ্ধ মা-বাবা আজ তার মাঝ বয়সী ছেলের গলা জড়িয়ে ধরে আকুল ভাবে কাঁদবে। যেন তার ছেলে আজ এমন কাজ করেছে যে ওই সুদুর বর্ডারে দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানদের মতই গর্বের। সত্যি, কতটা কষ্টই না সহ্য করতে হয় ওদের বেঁচে থাকার জন্য। আনন্দ উৎসব তো দূর অস্ত।
আর আমাদের এই ছেলেগুলো বলে কিনা রাজনীতি। এই প্রথম জানলাম যে মানবিকতাও একটা বিক্রয়যোগ্য বস্তু। এক সময় সমস্ত লীলা সাঙ্গ করে আমরা সকলে সন্ধ্যেবেলায় ফেরার উদ্দ্যেশ্যে গাড়িতে
চড়ে বসলাম। গাড়ি গড়িয়ে চললো এই অনাহারে ভোগা মানুষগুলোর থেকে দূর, দূর
অনেক দূরে। কাল থেকে আর ওই মানুষগুলোর কাছে কেউ জানতে চাইবে না যে আদৌ
তারা খেতে পেল কিনা। গাড়িতে উঠতে শুরু হয়ে গেল আনন্দের সংগীত আবার সেই
মদ গাঁজা নিয়ে গালাগালি।
সমাপ্ত …
