প্রবীর আচার্য

দ্বিতীয় পর্বের পর…..

এর সাতদিন পর ভাঁজো নাচ। সাতদিনেই শস্যবীজগুলি অঙ্কুরিত হয়ে বেশ লম্বা হয়ে যায়। —কারণ অন্ধকারে থাকায় সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না। ফলে বীজের মধ্যে সঞ্চিত খাদ্যেই তারা আলো পাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি লম্বা হয়। পাতা কিংবা ডালপালা বিস্তার করে না। যার বীজযত পুষ্ট, তার শ “সতত লম্বা। একে চলতি কথায় বলে শ”সপাতা। আসলে এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল আগামী হেমন্ত মরসুমে রবিশস্যের বীজ কার থেকে নেওয়া হবে তার নির্বাচন। কারণ অঙ্কুরিত শস্যপাত্রগুলি থেকেই প্রমাণিত হয়ে যায় কোন চাষির সংরক্ষিত বীজ সর্বোৎকৃষ্ট। ইঁদুরের গর্তের মাটি হল রোদ না পাওয়া আফলা মাটি। তাছাড়া সদ্য খোঁড়া যজ্ঞকুণ্ডের মাটিও রোদ না পাওয়া নীচের স্তরের মাটি, যাকে ইংরেজিতে বলে “সাবসয়েল”। এই আফলা মাটিতে বীজ কেমন অঙ্কুরিত হল সেটাই দেখার বিষয়। যার বীজ ভালো, তার কাছ থেকে অন্য চাষিরা বীজ পাল্টে নিয়ে যেত আগেকার দিনে।

ইঁদপুজোর সাতদিন পর কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী পড়ে। সেদিন বিকেলবেলায় হয় ভাঁজো পুজো এবং সেই সঙ্গে নাচ। এটা হল স্বর্গের অপ্সরীদের অনুকরণে একটা প্রতীকী নাচ। ইন্দ্রের রাজসভায় তাঁকে সন্তুষ্ট করতে অপ্সরাদের নাচ হয়। সেইরকম কৃষিদেবতা ইন্দ্ৰদেবকে সন্তুষ্ট করতে গাঁয়ের মেয়েরা নাচের মাধ্যমে তাঁকে ভজনা করে। ভজনা শব্দ থেকেই ভাঁজো কথার উৎপত্তি। ভিন্নমতে ভজনা নামে ইন্দ্রের এক শাপভ্রষ্ট অপ্সরী মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করেন তাঁর দ্বারাই এই প্রথার প্রবর্তন হয়। তাই ভাঁজো ঠাকরুন আসলে স্বর্গের অপ্সরী। অনেকটা কাকতাড়ুয়ার ঢঙে তৈরি হয় ভাঁজোর মূর্তি। দুটো কঞ্চি “যুক্ত” চিহ্নের মতো বেঁধে তার ওপর বসানো হয় ভাঁজো ঠাকরুনের মুণ্ডু। মাটির মুণ্ডুটা তৈরি করে দেয় কুমোররা। এইবার ভাঁজোদেবীকে ভালো করে সুন্দর কাপড় পড়ানো হয়। ভাঁজোর চারপাশে রাখা হয় অঙ্কুরিত শস্যের পাত্রগুলি, যাকে বলে শ’স পুরোহিত এসে ভাঁজো ঠাকরুনের পুজো করে দিয়েই কেটে পড়ে।

ক্রমশ……