ওয়েব ডেস্ক; ৩ জুলাই : কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে আরও সমন্বিত সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সমন্বয় এবং শক্তিশালী গবেষণা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন আজ। কলকাতায় জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI) বা প্রাণী সর্বেক্ষণ সংস্থার আয়োজিত অ্যানিম্যাল ট্যাক্সোনমি সামিট (ATS 4.0) বা প্রাণী শ্রণীবিন্যাস সংক্রান্ত শীর্ষসম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে তিনি এই আহ্বান জানান আজ।

জুন মাসের ৩০ তারিখ থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত আয়োজিত তিনদিনের এই সম্মেলন ZSI–এর ১১১তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫০০–রও বেশি বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে ট্যাক্সোনমি, সিস্টেমেটিক্স, প্রাণীবৈচিত্র্য এবং সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে ১০টি কারিগরি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত কৌশলগত সুপারিশগুলি ভবিষ্যতের পরিবেশ ও সংরক্ষণ–সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে সহায়তার জন্য ভারত সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কীর্তি বর্ধন সিং বলেন,

“জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং দূষণ বর্তমানে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে অন্যতম। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জ্ঞানের মাধ্যমে এমন সমাধান খুঁজে বের করা আমাদের দায়িত্ব, যা আমাদের মানুষ, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং আগামী প্রজন্মের উপকারে আসে।”

সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে সিং বলেন,

“কোনও একক প্রতিষ্ঠান সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সমন্বিত উদ্যোগই আমাদের পথপ্রদর্শক হওয়া উচিত। দেশের বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে একযোগে কাজ করতে হবে এবং জ্ঞান, পরিকাঠামো ও দক্ষতা ভাগ করে নিয়ে ভারতের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করতে হবে।”

মন্ত্রী যৌথ গবেষণাগার, সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার এবং সহযোগিতামূলক গবেষণা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

“বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সুযোগ আমাদের নেই। সহযোগিতা কেবল গবেষণার ফলাফলকেই সমৃদ্ধ করবে না, নীতিনির্ধারণ ও তার কার্যকর বাস্তবায়নকেও আরও শক্তিশালী করবে।”

বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিয়ে সিং বলেন,

“ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিংবা শাস্ত্রীয় শ্রেণীবিন্যাসকে উপেক্ষা করা যাবে না। একইসঙ্গে জীববৈচিত্র্য গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করতে রিমোট সেন্সিং, জিনোমিক্স, এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মতো আধুনিক পদ্ধতিকেও গ্রহণ করতে হবে।”

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরও বলেন, এই সম্মেলনে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হবে এবং দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যৌথ অঙ্গীকার আরও শক্তিশালী হবে।

“আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হল আগামী প্রজন্মের জন্য দেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা।”

সমাপনী অধিবেশনে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী পাঁচটি বৈজ্ঞানিক প্রকাশনারও উদ্বোধন করেন। এগুলিতে গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল বা স্বর্ণালি চতুষ্কোন মহাসড়ক নেটওয়ার্কের প্রাণীবৈচিত্র্য মূল্যায়ন, ভারতের জীবাশ্ম প্রাণীকুল, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ডিপ্টেরান প্রাণীকুল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের বন্যপ্রাণী তালিকা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

এই অধিবেশনে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করতে প্রাণী সর্বেক্ষণ সংস্থার পক্ষ থেকে চারটি কৌশলগত সমঝোতাস্মারক (MoU) বিনিময় করা হয়। সেন্টার ফর মেরিন লিভিং রিসোর্সেস অ্যান্ড ইকোলজি (CMLRE), কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, সত্যভামা ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চেন্নাই এবং অ্যান্থ্রপলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া–র সঙ্গে এই চুক্তিগুলি সম্পাদিত হয়। যৌথ গবেষণা, সামুদ্রিক ও স্থলজ জীববৈচিত্র্য, মলিকিউলার বায়োলজি, ডিএনএ বারকোডিং, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান, সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময় এবং বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে আন্তঃবিষয়ক সংরক্ষণ গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ATS ২০২৬–এর পোস্টার উপস্থাপনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করেন এবং ZSI–এর বিজ্ঞানীদের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি সম্পন্ন করা ২৭ জন গবেষককে সংবর্ধনা জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ড. কে. রবিচন্দ্রন, অধিকর্তা, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট (IIFM), ভোপাল; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের যুগ্মসচিব বেদ প্রকাশ মিশ্র; ZSI–এর অধিকর্তা ড. ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়; দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা–র প্রশাসক কর্নেল অনন্ত সিনহা; বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া–র অধিকর্তা ড. কনাদ দাস; ICAR–সেন্ট্রাল মেরিন ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CMFRI)–এর অধিকর্তা ড. গ্রিনসন জর্জ; অ্যান্থ্রোপোলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া–র প্রফেসর বি. ভি. শর্মা এবং ZSI–এর প্রবীণ বিজ্ঞানী, গবেষক ও আধিকারিকরা।