কলকাতা; ১৫ মে : ভারতীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্যে, জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI)-এর গবেষকরা দুটি নতুন মাকড়সার প্রজাতি আবিষ্কার এবং ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে ভারতীয় ‘হুইপ স্করপিয়ন’ (whip scorpions)-এর প্রথম বিস্তারিত শ্রেণীবিন্যাসগত সংশোধনের কথা ঘোষণা করেছেন।
বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘জুটাক্সা’ (Zootaxa)-তে প্রকাশিত এই ফলাফলগুলি বিরল এবং গুপ্ত প্রাণীকুলের সার্বিক হটস্পট হিসাবে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
নাগাল্যান্ডে নতুন আবিষ্কার
জেডএসআই-এর (ZSI) বিজ্ঞানীরা ‘সেক্রাস’ (Psechrus) বর্গের অধীনে আগে অজানা দুটি মাকড়সার প্রজাতি শনাক্ত করেছে: ‘সেক্রাস এনটু’ (Psechrus ntu) এবং ‘সেক্রাস ফেনশুনইউ’ (Psechrus phenshunyu)। নাগাল্যান্ডের যে গ্রামে এগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে— এনটু এবং ফেনশুনইউ— তাদের নামানুসারেই এই অ্যারাকনিডগুলির নামকরণ করা হয়েছে। এই মাকড়সাগুলো আর্দ্র বনভূমিতে চাদরের মতো বিস্তৃত অনুভূমিক জাল বোনার জন্য পরিচিত।
অধ্যয়নের মূল ফলাফলগুলির মধ্যে রয়েছে:
**স্বতন্ত্র অঙ্গসংস্থান: নতুন প্রজাতির শরীর লম্বাটে ও চ্যাপ্টা এবং এদের সামনের পাগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ ও শীর্ণ।
- সীমানার বিস্তার: গবেষকরা উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রথমবারের মতো ‘সেক্রাস হিমালয়ানাস’ (Psechrus himalayanus)-এর উপস্থিতি নথিবদ্ধ করেছেন, যা এর পরিচিত হিমালয় অঞ্চলের সীমানাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে।
- অনন্য আচরণ: বিজ্ঞানীরা একটি পুরুষ ‘পি. হিমালয়ানাস’-কে একটি ‘পি. ফেনশুনইউ’-এর সাথে জাল ভাগ করে নিতে দেখেছেন। এটি একটি বিরল “হেটেরোস্পেসিফিক অ্যাসোসিয়েশন” (ভিন্ন প্রজাতির সাহচর্য), যা মাকড়সার সামাজিক আচরণ সম্পর্কে বর্তমান ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এই নতুন সংযোজনের ফলে ভারতজুড়ে ‘সেক্রাস’ বর্গের এখন নয়টি প্রজাতি রয়েছে, যদিও তাদের বিস্তৃতি অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন।
“ভিনিগারুনস”: এক শতাব্দীর রহস্য সমাধান
দ্বিতীয় একটি যুগান্তকারী গবেষণায়, জেডএসআই-এর গবেষকরা ভারতীয় ‘থেলিফনিডস’ (Thelyphonids)-এর প্রথম বড় ধরনের সংশোধন সম্পন্ন করেছেন, যা সাধারণত ‘হুইপ স্করপিয়ন’ বা “ভিনিগারুনস” নামে পরিচিত। প্রকৃত বিছের মতো এই প্রাণীদের বিষ থাকে না; পরিবর্তে এদের একটি সরু চাবুকের মতো লেজ (ফ্ল্যাজেলাম) থাকে এবং শিকারিকে তাড়াতে এরা ভিনিগারের মতো অ্যাসিড স্প্রে করে। বিশ্বজুড়ে এই জীবের মাত্র ১৩৮টি প্রজাতি পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও, ভারতে এই দলটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অনেকটা উপেক্ষিত ছিল।
সংশোধনের বিশেষ দিকগুলি:
- পুনর্বর্ণনা: এই গবেষণায় ভারতে পরিচিত পাঁচটি প্রজাতির মধ্যে চারটির আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
- জৈব-ভৌগোলিক মানচিত্রায়ন: গবেষকরা এই বিরল অ্যারাকনিড বা মাকড়সা জাতীয় গুলির বিস্তৃতির মানচিত্র তৈরি করেছেন। এতে ভারতের পূর্ব সীমান্তে (বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং চীন সংলগ্ন) এদের উপস্থিতি এবং উত্তর-পশ্চিমে (পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান) এদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
জীববৈচিত্র্যের ব্যবধান দূর করা
জেডএসআই-এর অধিকর্তা ডঃ ধৃতি ব্যানার্জি ভারতীয় জীববৈচিত্র্যের “হোয়াইট হোলস” বা নথিভুক্ত নয় এমন এলাকা ও প্রজাতিগুলি অন্বেষণে প্রতিষ্ঠানের অঙ্গীকারের ওপর জোর দিয়েছেন। ডঃ ব্যানার্জি বলেন, “জেডএসআই অস্পষ্ট প্রাণীকুল সম্পর্কিত তথ্য নথিবদ্ধ করার মাধ্যমে ক্রমাগত নতুন পথে পা বাড়াচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হল, এটি নিশ্চিত করা যে, এমনকি সবচেয়ে রহস্যময় প্রাণগুলিও যেন আমাদের জাতীয় ভাণ্ডারে নথিভুক্ত থাকে।”
এই গবেষণাগুলি কেবল অ্যাকাডেমিক বা অধ্যয়নের আগ্রহের বিষয় নয়; আধুনিক সংরক্ষণের জন্যও এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেডএসআই-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণার সহ-লেখক ডঃ সৌভিক সেন বলেন, “এই কাজগুলি ঐতিহাসিক শ্রেণীবিন্যাস এবং আধুনিক সংরক্ষণের প্রয়োজনের মধ্যে একটি সেতু হিসাবে কাজ করে, যা কয়েক দশক ধরে উপেক্ষিত থাকা প্রাণীগোষ্ঠীগুলির জন্য একটি ভিত্তি প্রদান করতৃ সাহায্য করে।”
সূত্র: পি আই বি
