ওয়েব ডেস্ক; ৫ মে : উচ্চ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার স্বচ্ছ পাহাড়ি স্রোতে বসবাসকারী ‘চান্না স্টুয়ার্টি’ (Channa stewartii), যেটি সাধারণত ‘অসমীয়া স্নেকহেড’ নামে পরিচিত, উত্তর-পূর্ব ভারতের জলজ জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য অথচ অবহেলিত প্রাণী। আকারে ছোট (প্রায় ২০ সেমি) হলেও, উজ্জ্বল নীল পাখনা এবং শরীরের বিশেষ ডোরাকাটা দাগের কারণে এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। বাহারি মাছের বাজারে এর ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে বর্তমানে প্রতি জোড়া মাছ ৬০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে, বন্য পরিবেশ থেকে অতিরিক্ত মাছ আহরণ করা হচ্ছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বন্দী দশা বা আটক অবস্থায় প্রজননের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি না থাকায় এই প্রজাতির সংরক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যের প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছিল।
এই অভাব পূরণের লক্ষ্যে, আইসিএআর–সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICAR-CIFRI), গুয়াহাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে বাহারি মাছের প্রজনন ও চাষ বিষয়ক ‘এআইএনপি’ (AINP)-র আওতায় এক অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে, প্রায় ৩০টি বন্য ব্রুডার (ওজন ২০০-২৩০ গ্রাম) নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়ে পদ্ধতিগত প্রজনন গবেষণা শুরু করা হয়।
স্বাভাবিক প্রজনন আচরণকে উৎসাহিত করতে গবেষকরা সিমেন্টের ট্যাঙ্কে বালি, বাঁশের কাঠামো এবং মাটির আশ্রয়ের সমন্বয়ে একটি আধা-প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। এই কৃত্রিম আবাসস্থল মাছের মানসিক চাপ কমিয়ে তাদের প্রজনন সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা কঠোর বৈজ্ঞানিক প্রোটোকল মেনে করা হয়েছিল, যেখানে জলের গুণমান বজায় রাখার পাশাপাশি, প্রজনন অঙ্গের পরিপক্কতা বৃদ্ধির জন্য কেঁচো, পিঁপড়ের লার্ভা এবং জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো জীবন্ত খাবার সরবরাহ করা হয়েছিল।
গবেষকরা জানিয়েছেন, সুস্পষ্ট লিঙ্গভেদের মাধ্যমে একটি পরিণত প্রজনন জোড়া শনাক্ত করে পুরুষ মাছের মধ্যে বিশেষ চিহ্ন এবং মিল্ট নিঃসরণ দেখা যায় এবং স্ত্রী মাছের স্ফীত উদর ও ডিম্বাণু নিঃসরণ লক্ষ্য করা হয়। এই জোড়াকে একটি আধা-প্রাকৃতিক এফআরপি (FRP) ট্যাঙ্কে স্থানান্তরিত করার পর সফলভাবে ডিম পাড়ে মাছটি। এই প্রজাতির ডিম প্রদানের ক্ষমতা (fecundity) ১৫৭৮ থেকে ২৭৬৯টি পর্যন্ত ছিল এবং ডিমগুলি ছিল গোলাকার ও ভাসমান (আকার প্রায় ৮২০ মাইক্রোমিটার)।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে, আইসিএআর-সিআইএফআরআই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে: ভারতে প্রথমবারের মতো ‘চান্না স্টুয়ার্টি’-র সফল প্রাকৃতিক প্রজনন ও লার্ভা বা শূককীট পালন সম্পন্ন হয়। ডিম ফোটার সাফল্যের হার ছিল ৭৩%। লার্ভাগুলি (~৮.৪ মিমি) সক্রিয় চলাফেরা এবং পিতামাতার যত্ন প্রদর্শন করেছিল। এই গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সফলভাবে লার্ভা বা শূককীট লালন-পালনও সম্পন্ন হয়েছে—যা এই প্রজাতির বংশবৃদ্ধির চক্রটি সম্পূর্ণ করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সাফল্য কোনো হরমোন প্রয়োগ ছাড়াই অর্জিত হয়েছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাকেই তুলে ধরে। এটি বাহারি মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় এবং পরিবেশবান্ধব মডেল তৈরি করেছে।
আইসিএআর-সিআইএফআরআই-এর অধিকর্তা ডাঃ প্রদীপ দে বলেন, “এই অর্জন বাহারি মৎস্য শিল্পের বিকাশে একটি সুস্থায়ী পথ তৈরি করে দিয়েছে। পিএমএমএসওয়াই (PMMSY)-এর অধীনে হ্যাচারি উৎপাদন বৃদ্ধি করা, বন্য মাছের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং যুবক ও চাষিদের মধ্যে একুয়াপ্রেনারশিপ (aquapreneurship) বা মৎস্য বিষয়ক উদ্যোক্তা তৈরির প্রসার ঘটানো এখন জরুরি। সেই সঙ্গে আইসিএআর, কেভিকে এবং রাজ্য মৎস্য দপ্তরের নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতে শক্তিশালী শংসাপত্র ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত আহরণ পদ্ধতি এবং আঞ্চলিক ক্লাস্টারিং গড়ে তোলা সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
বৈজ্ঞানিক মূল্যের পাশাপাশি, এই সাফল্য বন্য মাছের ওপর চাপ কমিয়ে সংরক্ষণ এবং জীবিকার পথ প্রশস্ত করেছে। ভারতের প্রথম নথিভুক্ত সাফল্য হিসাবে এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরি, ব্যাপক আকারে বংশবৃদ্ধি এবং সুস্থায়ী বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ খুলে দিয়েছে—যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেলবন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।
এই ঐতিহাসিক অর্জনের নেপথ্যে রয়েছেন ডাঃ নীতি শর্মা, সুমন কুমারী এবং দিবাকর গগৈ-এর গবেষকদল এবং নেতৃত্ব ছিলেন ডাঃ সুল্লিপ কুমার মাঝি ও ডাঃ রঞ্জন কে মান্না।
