অজিত ঘোষ

সেদিন ছিল তিতলির বিএ ফাইনাল ইয়ারের শেষ পরীক্ষা। আমাদের দুজনের একই শহরে বাস। পাশাপাশি নয়, আমার বাড়ি থেকে তিতলির বাড়ির মাঝে ছিল আরো দুটো পাড়া । তখন আমি সদ্য বিএ পাস করে চাকরি খুঁজছি সঙ্গে দু’চারটে টিউশন ব্যাচ পড়িয়ে চলছে হাত খরচের জোগান। তিতলির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব চার বছরের। তার আগে কোনদিন আমাদের কথা দূরে থাক দেখা পর্যন্ত হয়নি ।

সেদিনও আমি তিতলির ছায়াসঙ্গী। প্রায় প্রতিটি পরীক্ষার দিন আমার কাজ ছিল। তিতলির সঙ্গে যাওয়া। ওঁর পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আমি কলেজ গেটের বাইরে অপেক্ষা করতাম তারপর তিতলির পরীক্ষা শেষে একসঙ্গে ফিরে আসতাম। এমন নয় যে সে একা যেতে পারতো না, খুব পারতো। স্বাধীনচেতা আধুনিক মেয়ে ছিল সে। কিন্তু তার কথায়, আমি পাশে থাকলে নাকি তার মনোবল বাড়ে। দশ কিলোমিটারের দূরত্ব। সমস্ত রাস্তাটাই তিতলি পাশাপাশি সিটে আমার কাধে মাথা রেখে যেত। ওর খোলা চুল বাসের জানলা দিয়ে আসা হাওয়ায় খেলে যেত আমার চোখে মুখে। সেই সুখের পরশটুকু পেতে আমি তিতলির সঙ্গে যেতাম।

সেদিন পরীক্ষা শেষে তিতলিকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছিল। এতদিন পরে বুঝতে পারি, তিতলির ব্যস্ততাকে আমি পরীক্ষার চাপ ভেবে ভুল করেছিলাম। শেষ পরীক্ষার দিন, দেরি করে বাড়ি ফিরবে বলে তিতলি পরীক্ষা শেষে আমায় নিয়ে গেল স্টেশনে। পৌঁছেই মত বদলালো। নাচের ক্লাস আছে কাছাকাছি কোথাও, বেশিক্ষণ লাগবে না। আমায় স্টেশনের বাইরে অপেক্ষায় রেখে হস্তদন্ত হয়ে চলে গেল। আমি ভিড়ে মিশে যাওয়া তিতলিকে দেখলাম।

অপেক্ষা করছি। তিতলি ফিরবে। বিকেল পেরিয়ে সন্ধে হল, সন্ধে পেরিয়ে গেল একসময়। তিতলি ফিরছে না। টেনশনে, পিপাসায় আমি তিতলির ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগের পকেট চেন খুললাম। তিতলি যাবার সময় ব্যাগটি আমার জিম্বায় রেখেছিল। জলের বোতল পেলাম না, পেলাম একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ। উপরে আমার নাম লেখা।

কাগজের ভাঁজ খুললাম। তিতলি লিখেছে, ‘আমি জানি তুমি যতক্ষণে চিঠিটা পড়বে, ততক্ষণে আমি কৌশিকের হাত ধরে পেরিয়ে এসেছি বেশ কয়েকটি স্টেশন। আমার আর ফেরার উপায় নেই। আমাদের জীবনটা তো নদীর মতো। পেছন ফেরা তার নিষেধ। তোমাকে ব্যাগটা দিয়ে এসেছি। আমার বিশ্বাস ব্যাগ ও চিঠি তুমি দায়িত্ব সহকারে বাড়িতে পৌছে দেবে। ভালো থেকো। কোনদিন দেখা হবে।

ক্রমশ……