মাসুদ করিম (বাংলাদেশ)

প্রথম পর্বের পর….

ভারত – বাংলাদেশ সম্পর্ক আজও সেই রক্তের অক্ষরে আঁকা পথেই চলছে। তবে সেই পথ একেবারে সরল রেখায় অগ্রসর হয়েছে এমন নয়। সেই পথ তাই সোজাপথ নয়। আঁকাবাঁকা। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগ, রক্তদান, শরণার্থীদের আশ্রয়দান, অস্থায়ী সরকার গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ভারতের অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে দুই দেশের জনগণ শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, অগ্রযাত্রায় পাশাপাশি হেঁটেছিলেন। ইতিহাসের সেই ধারায় ছন্দপতন ঘটে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিষ্ঠুর বুলেটে খুন হন বাংলাদেশের জাতির পিতা এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য। দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সৌভাগ্যবশত বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। ক্ষমতার মসনদে বসেন জিয়া, তারপর এরশাদ। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সহযোগিতার অমিত সম্ভাবনা অনেকাংশে সুপ্ত হয়ে যায়। গুপ্ত ধারায় গতি সঞ্চার করেন শেখ হাসিনা। আমাদের দুই দেশ অভিন্ন নদীগুলির জলবন্টন, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ বাড়ানো, নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা, অভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একত্রে জোরেশোরে কাজ করা শুরু করে। তবে সহযোগিতার মাত্রা আরও কয়েকগুণ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশের মধ্যে কিছু কিছু অনিস্পন্ন ইস্যু আছে যা প্রতিবেশী অনেক দেশের মধ্যে থাকে। তবে আমাদের নেতারা রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে অগ্রসর হলে সেগুলি নিস্পত্তি করা অসম্ভব নয়।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি অভিন্ন স্থলসীমান্ত থাকলেও মাত্র সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা অচিহ্নিত ছিল। একে অন্যের ভূমি অপদখলীয় ছিল। সেই সীমান্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে। ছিটমহল বিনিময় হয়েছে। সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিরাপত্তার সংকট ছিল। শেখ হাসিনার উদ্যোগে ভারতের ওই উদ্বেগ নিরসন হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বাংলাদেশের মানুষ চায় গঙ্গার মতো তিস্তার জলবন্টন চুক্তি। সীমান্তে মানুষের মৃত্যু যেন বন্ধ হয়। উভয় দেশের মানুষ চায়, সংখ্যালঘুরা নিরাপদে বাস করুক। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পর্কে যেন ক্ষতি না হয়। এসব করার বিষয়ে ভারতে এবং বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য আছে। মানুষের এসব প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু চাওয়া নয়, অসম্ভবও নয়।

এসব চাওয়ার পূরণ হলে দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আকাশ ছুঁবে। বিশ্বে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মডেল হবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। বাংলাদেশের মানুষের আশা, ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য আগামী দিনে আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রতি বছর ১৫ লাখের বেশি বাংলাদেশী ভারত যায়। চিকিৎসা, বাণিজ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময়, আরও অনেক কাজে। আমাদের উভয় দেশে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম। গঙ্গা-যমুনা আমাদের উভয়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত। প্রবাহিত হয়েছে ৫৪টি অভিন্ন নদীর ধারা। গড়ে উঠেছে অববাহিকাভিত্তিক জীবনধারা।

ক্রমশ…..