সঞ্জয় চক্রবর্তী

দ্বিতীয় পর্বের পর ….

দেখে ভালই লাগলো। মনে মনে ভাবলাম ভগবান যখন এক দরজা বন্ধ করেন তখন অন্য দরজা আবার খুলেও দেন। এই অতিমারিতে এবং ঝড়ে মানুষের যেমন কিছু

কর্মসংস্থান ও বাসস্থল নষ্ট হয়েছে, তেমনি কিছু ধরনের মানুষের এই অসময়ে রোজগার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমার এই অপ্রাসঙ্গিক আনন্দ মুখ থুবরে পড়তে বেশি সময় লাগল না।

হঠাৎ দেখি গদাই ওই লোকগুলোর সঙ্গে বেশ গুরুগম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে আবার নেশা করা দলটাও আছে। ওরাও যেন হাত-পা নেড়ে কি বোঝানোর চেষ্টা করছে। ওই মানুষগুলো ওদের কথায় খুব মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিয়ে চলেছে। শেষে ওদের হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় ওদের ওপারের ঘাটে আসতে বলতে এপারেই নামিয়ে দিয়ে ওরা হাত নেড়ে চলে গেল। নৌকা ছেড়ে দিলো ওপারের দরিদ্র বাস্তুহারা মানুষগুলোর উদ্দেশ্যে। পেটের জ্বালায় ওরা এমন জ্বলছে যে এমন শরীর জ্বালিয়ে দেওয়া রোদকে তোয়াক্কা না করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা নৌকা আসছে, হয়তো সঙ্গে করে নিয়ে আসছে আমাদের মতন অভুক্ত পরিবারের জন্য আরও একটা দিনের আহার।

আমি বললাম, এই গদাই, ওই সবের মধ্যে আবার তুই ওদের জন্য মদের ব্যবস্থা করতে গেলি কেন? এতগুলো টাকা দিয়ে বরং আরও কিছু পরিবারের জন্য খাবার কিনতে পারতিস। মদ তো তোরা বাড়ি ফিরেও খেতে পারবি। কিন্তু আমাদের মতন মানুষরা না আসলে যে ওরা ভালো মন্দ খেতে পারে না। গদাই উত্তর দিল, তুমি সব ব্যাপারে একটু বেশি সেন্টি হয়ে যাও। যাদের জন্য মাল

গুলো কিনতে পাঠালাম এইগুলো না দিলে তারা পরের বার শত ডাকলেও আসবেনা।

রাজনীতিটা একটু বোঝো। যাদের ত্রাণ দিচ্ছি ওরা তো হারামে পাচ্ছে, এটাই যথেষ্ট। -কি বলছিস রে ভাই হারামে পাচ্ছে !! পাড়ায় যেদিন বলেছিলি যে গরিবের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারলেই স্বর্গসুখ, সহমর্মী হয়ে দাঁড়াতে পারলেই আসল আত্মসুখ ওসব কি তাহলে শুধুই

-ওসব বুঝবে না ওপারে চলো দেখবে মস্তি কাকে বলে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে হঠাৎ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। মস্তি? মস্তি কিরে? আমরা তো অনাহারে থাকা মানুষদের খাদ্য সংস্থান করতে ওদের পাশে দাঁড়াতে এলাম, আবার মস্তি কিসের? -তোমার নামটা যে দিয়েছিল সত্যি সে খুব বুদ্ধিমান ছিল। ওপারে চলো সব সেটিং

করা আছে মদ-মাংস সব রেডি। চলো দেখবে আপন মনে বিড়বিড় করে উঠলাম। ” হ্যাঁরে ভাই গদাই, সেই দিন সেই আমাকে চিনেছিল, আজ তুই আমাকে যথাযথই বুঝলি। শুধু নিজেই নিজেকে ঠিক চিনে উঠতে পারলাম না।

নৌকা জেটিঘাটের কাছে আসতেই দেখলাম শয়ে শয়ে পুরুষ-মহিলা-বাচ্চা সকলে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। খিদের জ্বালায় শুকিয়ে পানসে হয়ে রোদে পুড়ে শুকনো হয়ে যাওয়া মুখগুলোতে যেন একটা আনন্দের জোয়ার এসেছে। ভাবটা এমন, একদল ভালো মানুষ কত দূরের শহর থেকে আমাদের জন্য খাদ্য সংস্থান নিয়ে আসছে।

ক্রমশ ……….