গার্গী সিনহা
চতুর্থ পর্বের পর….
ডুয়ার্সে কাঠচেরাই কলে তক্তা তৈরির বিদ্যা আমদানী করেছিল ইংরেজরা, নিজেদের অর্থনৈতিক তথা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। উনিশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি অঞ্চলের দখল নিয়েই তারা একের পর এক স্থানীয় অরণ্যনির্ভর কাঠচেরাই শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে খুব তাড়াতাড়ি ডুয়ার্সের আদি অরণ্য ও সংশ্লিষ্ট বাস্তুতন্ত্রের আমূল পরিবর্তন এবং কোথাও বিনাশ ঘটতে থাকে। অবশ্য ধ্বংস হওয়া অরণ্যের সযত্ন পুননির্মাণও হয়েছিল এই ইংরেজদেরই উদ্যোগে। তবে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ দীর্ঘমেয়াদী ও নিরবচ্ছিন্ন করার ‘মহৎ’ উদ্দেশে তারা বদলে দিয়েছিল অরণ্যের চিত্র; একদিকে অরণ্যে স্বাভাবিক বৃক্ষশ্রেণীর উদ্ভিদের বদলে অধিক অর্থনৈতিক মূল্যবিশিষ্ট বৃক্ষ (যেমন— সেগুন ইত্যাদি, যা আদতে সম্পূর্ণ অন্য বাস্তুতন্ত্র তথা ভৌগোলিক অঞ্চলের উদ্ভিদ) প্রচুর পরিমাণে লাগানো হতে থাকল, অন্যদিকে ডুয়ার্সের ক্রান্তীয় অরণ্যের প্রধান বৈশিষ্ট— একই সঙ্গে নানা প্রজাতির উদ্ভিদের সহাবস্থান – উপেক্ষা করে গুরুত্ব দেওয়া হতে থাকল Monoculture-এ অর্থাৎ একই ধরণের উদ্ভিদ দ্বারা বনসৃজনে। ফলস্বরূপ স্বাভাবিক মিশ্র অরণ্য কোথাও সামগ্রিকভাবে কোথাও বা খন্ডাংশ হিসাবে প্রতিস্থাপিত হতে থাকল শুধুই শালবন বা শুধুই সেগুনবন দ্বারা। এর বাস্তুতান্ত্রিক অনস্বীকার্যও অপূরণীয় হলেও নিতান্তই অর্থনৈতিক লাভের স্বার্থে স্বাধীন ভারতে এই ট্র্যাডিশন আজও বহাল তবিয়তে চলছে। যাই হোক, চেরাইকালে তৈরি তক্তা ডুয়ার্সের দেশজ মানুষদের কাছে সস্তা কিংবা 3) সহজলভ্য ছিল না। প্রাথমিকভাবে তক্তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল এখানকার দেশজ বাসগৃহ নির্মাণশৈলী দ্বারা অনুপ্রাণিত ইংরেজদের বাংলাবাড়ি (বাসগৃহ ও অফিস বাড়ি-উভয় কাজেই ব্যবহৃত) তৈরিতে এবং পরবর্তী সময়ে এগুলির অনুকরণে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে থাকা ডুয়ার্স ও সংলগ্ন জনপদগুলিতে দেশীয় অর্থবান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর (যেমন— পূর্ববঙ্গীয় বাঙালী, অবাঙালী ইত্যাদি) বাসগৃহ নির্মাণে। বিগত কয়েক দশকে অবশ্য টোটো, মেচ প্রভৃতি দেশজ জনজাতির মধ্যেও ব্যক্তি বিশেষের মধ্যে আর্থিক সঙ্গতি বাড়ার নিদর্শন হিসাবে গৃহনির্মাণে কাঠের তক্তার ব্যবহার বেড়েছে।
ক্রমশ…….
