চন্দন চক্রবর্তী
বিগ্রহের পায়ে ছোঁয়ানো হত আবির, ফুলের অঙ্গসজ্জা পরানো হত। ভোগপ্রসাদ-সাদা গোলাপি বাতাসা, সাদা রঙিন মঠ, ছাড়াও মুড়কি কদমা, ফুটকড়াই খাওয়া হত। বিকেলে ওস্তাদ বসিয়ে গান বাজনার আসর বসত। নিধুবাবুর টপ্পা, যদু ভট্টের গান, কবির তরজা, বাঈজি নাচ । বৈষ্ণবরা আয়োজন করতেন কীর্তন গানের। এরও পরে চালু হয় নাট্যাভিনয়ের। দোললীলা, বসন্তলীলা, প্রহ্লাদ পালা, কংসবধ পালা, গান… এসব চালু হয়।
বিবাদীবাগে ‘লালদিঘি’ এখনও প্রাচীন কলকাতার দোল উৎসবের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। রঙ খেলার পর ওই দিঘিতে সব মানুষ স্নান সারতেন। জলের রঙ লাল হয়ে থাকত, বেশ কয়েকদিন। লালদিঘি সেদিনের বা আজকের লালবাজার। কলকাতার জেলে বা কৈবর্তপাড়া থেকে দোলের দিন সঙের দল বেরতো। কৃষ্ণপুজোর সঙ্গে সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষদের বিশেষ সংস্পর্শ ছিল না। তাদের আরাধনায় ছিল লৌকিক দেবদেবী শীতলা, ষষ্ঠী, বাগুলি, শিব ইত্যাদি।
ফিরে আসি আজকের দোল বা রঙ-উৎসবে। বিশাল কমপ্লেক্সে বাঙালির সঙ্গে বহু অবাঙালির বাস। গুজরাটি, মাড়োয়ারি, বিহারি, উড়িয়া ছাড়াও বিভিন্ন প্রদেশের বাস। আজ যেমন আমাদের রং খেলা, তেমন আগামীকাল ওদের হোলি। সন্ধেতে ন্যাড়াপোড়ানো। আমাদের সব ব্যাপারে বিশেষ করে ওই দোল খেলায় উৎসাহ বা উদ্দীপনা অনেক কম। বুঝলাম ওদের চাঁচর পোড়ানো উৎসব দেখে। বিশাল জায়গা জুড়ে শুকনো ডালপালার স্ট্রাকচার বানানো হয়েছে। দাউ দাউ আগুন জ্বলছে-মহিলারা গোল করে সাতপাক মারতে থাকে। হাতে পুজোর সামগ্রী। কে কটা পাক দেবে নির্ভর করছে সেটা তাদের জাতের নিয়মের ওপর। সাত, পাঁচ, তিন, দশ হতে পারে। এই উজ্জ্বল আগুন ওদের কাছে খুব পবিত্র, কাঁচা ছোলার গাছ পুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে অনেকে। ওই পোড়া ছোলাই প্রসাদ। কেউ বিশাল হাতায় পাঁপড় পোড়াচ্ছে। সেটা বাড়ি নিয়ে গিয়ে প্রসাদ হিসাবে খাবে। কেউ নিয়ে গেল পবিত্র ছাই। বাড়িতে থাকা শুভ।
শেষ হল ন্যাড়াপোড়ানো উৎসব। হঠাৎ মনে হল ছোটবেলায় যে আলু পুড়িয়ে খেতাম সেটা কি নিছক খেলা ছিল। নাকি ওটাও প্রসাদ ছিল- কী ছিল, জানি না। তবে এই বৃদ্ধ বয়েসে যখন বাড়ি ফিরছি তখন হঠাৎই সেই আলুপোড়ার মিঠে গন্ধটা পেলাম। সেই স্বাদ পেলাম। সেই ফুলকি আগুনের শিখায় আলোকিত গ্রামের মাঠটা দেখতে পেলাম সেই ছোট বন্ধুরা… দৌড়াচ্ছে। আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল। হয়তো অনেকে আর নেই। আমার মত কেউ কেউ আছে স্মৃতি রোমন্থন করছে… আমার মতো…।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : কিছু কলকাতা বিষয়ক পুরানো গ্রন্থ।
