চন্দন চ্যাটার্জী

ভগবান বুদ্ধের সংস্পর্শে ভিক্ষু আনন্দ যেমন শ্রেষ্ঠ শ্রমণ হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি তার সঙ্গলাভে সাধনা এবং জ্ঞানের উচ্চস্তরে যেতে পেরেছিলেন অনেকেই। জ্ঞানী সাধিকা ক্ষেমা ছিলেন তাদের অন্যতম। তার পরিচয় পাওয়া যায় এমন অনেক ঘটনা আছে। একবার রাজা প্রসেনজিৎ সপর্ষদ শ্রাবস্তী নগরের দিকে যাচ্ছেন। কিছুদিন যাবৎ রাজার মনে বুদ্ধের নির্বাণ তত্ত্বের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসছে ৷ যাত্রাপথেও তার বিরাম ছিল না। হঠাৎ পথে দেখা ভিক্ষুনী ক্ষেমার সাথে। রাজা প্রসেনজিৎ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তথাগত কেন নির্বাণ তত্ত্বের অর্থ উদ্‌ঘাটন করেননি। জ্ঞানী সাধিকার মুখে ফুটে উঠল এক উজ্জ্বল হাসি। তিনি রাজাকে প্রশ্ন করলেন, তার দক্ষ হিসাবরক্ষক কি বলতে পারবেন সমুদ্রের জলরাশি এবং নদী তীরের বালিকণার সংখ্যা?

রাজা জানালেন, এর পরিমাপ করার শক্তি তার হিসাব রক্ষক কেন, কেউই রাখেন না। তখন ভিক্ষুনী ক্ষেমা বললেন, অগণিত বালুকণা এবং জলরাশির মত নির্বাণপ্রাপ্ত তথাগতের অস্তিত্ব এমনই অতল অগাধ।

প্রায় আশি বছর বয়স তখন তথাগত বুদ্ধের (আনুমানিক ৪৮৩ খ্রীষ্ট পুর্বাব্দের কথা)। তিনি বুঝতে পারছেন যে শেষ অধ্যায় সমাগত। শেষবারের মত সমস্ত ভক্তদের দর্শন দিয়ে যেতে চান তিনি। তাই অসুস্থ শরীরেই বেড়িয়ে পড়লেন রাজগৃহ থেকে। যাত্রাপথে ভক্ত এবং ভিক্ষুরা লক্ষ্য করল যে তাদের প্রাণাধিক তথাগত রোগ-জরাতে একেবারে পর্যদুস্ত হয়েও এগিয়ে চলেছেন স্থির লক্ষ্যের দিকে। পথমধ্যে ভিক্ষুদের বাণী শুনিয়ে সমৃদ্ধ করে তুলছেন। তিনি বললেন, নিজেরাই নিজেদের আত্মবিশ্বাস এবং তপস্যার মধ্যে দিয়ে পরম আশ্রয় খুঁজে নাও। কারণ যে ভিক্ষু ধর্মাশ্রয় এবং ধর্মাচরণ নিয়ে থাকবে, তার ভাগ্যেই জুটবে অন্ধকার থেকে আলোর উত্তরণ।

যাত্রাপথে কুহক নদীতে স্নান করে সঙ্গী ভিক্ষুদের নিয়ে অবস্থান করছিলেন বুদ্ধ। এখানে আসার আগে তথাগত তার এক পরম ভক্ত চুন্দের অন্নগ্রহণ করে এসেছিলেন। কিন্তু রোগগ্রস্থ শরীরে সে আহারের ভার নিতে অপারগ। তাই তিনি বললেন যে, তার মৃত্যুর কারণ যেন চুন্দের আহার বলে প্রচার না করা হয়। এই সময় আনন্দ লক্ষ্য করলেন, এক অপূর্ব জ্যোতি তথাগতের শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে। গুরুর কাছে জানতে চাইলে তথাগত বলেন, সুজাতার হাতে পায়েস খেয়ে বোধীবৃক্ষতলেও এমন জ্যোতি প্রকাশ পেয়েছিল। আজও তার আবির্ভাব পরিনির্বাণেরই শুভক্ষণ বলে মনে হচ্ছে। কুশীনদীর কাছে একটি শালবনে গাছের নীচে অসুস্থ তথাগত বুদ্ধের শয্যা বানিয়ে আনন্দ দূরে গিয়ে কাঁদতে লাগল। প্রিয় শিষ্যের এই শোকচ্ছ্বাসে কার্যত বিব্রত বুদ্ধদেব আনন্দকে কাছে ডাকলেন। অন্যান্য ভিক্ষুদের সামনে তার পবিত্রবাণী শোনালেন, ‘এ জীবন নশ্বর, সমস্ত কিছু ত্যাগ করে আমাদের চলে যেতেই হবে। কারণ যে বস্তুর উৎপত্তি আছে তার বিনাশ ও আছে।’

অবশেষে কুশীনগরের মল্ল শালবনে রাত তিনটে নাগাদ তথাগত বুদ্ধ অমৃতলোকে যাত্রা করেন। গোরখপুরের কাছে এই স্থান দর্শন করতে আজও বহু মানুষ এখানে ভীড় করেন, শ্রদ্ধা জানান সেই পবিত্র আত্মাকে।